বিপ্রর লেখক ও পাঠক প্রায় সকলেই জানেন হ্যাকিং কি। এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হতে পারে সেটাও অনেকেরই জানা। তারপরেও বলি হ্যাকিং হলো কোনো সিস্টেম এ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করা এবং স্বীয় স্বার্থ উদ্ধার করা। এটি একটু লম্বা প্রক্রিয়া। প্রথমে সিস্টেমটি নিয়ে গভীর ভাবনা। ভাবনাটি সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে বের করার। আর সেই দুর্বলতা খুঁজে পেলে কর্মে নেমে পড়া। আর এই কাজটি অর্থাৎ হ্যাকিং যিনি করেন তিনি হ্যাকার বলে স্বীকৃত। তবে এর যে শুধু খারাপ দিক আছে সেটি বলার দু:সাহস আমার নেই, কারো আছে কিনা সেটি জানা নেই। কারণ হ্যাকিংয়ের ফলে একপক্ষ যেমন লাভবান হয়, বিপরীতে অন্য পক্ষ্যের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা বেশি। যাই হোক আমার জানামতে আমি হ্যাকার নই। তাই এই বিষয়ে বিদ্যা জাহির হীতে বিপরীত হতে কতক্ষণ!

এই ব্লগের পাঠকসহ প্রায় সকলেই জানেন, কয়েক বছর ধরেই বেড়েই চলেছে হ্যাকিং প্রবনতা। গত ৫ বছরে সাইবার হামলার শিকার হয়েছে জাতিসংঘ, তাইওয়ান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কানাডা, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংস্থা- আশিয়ান, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি- ওআইসি, ওয়ার্ল্ড এন্টি-ডপিং এজেন্সিসহ বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ২০০৮ সালে হ্যাকাররা জেনেভায় জাতিসংঘ সচিবালয়ের কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করে। এতে হ্যাকাররা পর্যাপ্ত সংখ্যক গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়। ফলে জাতিসংঘকে প্রায় ২ বছর ভোগান্তি পোহাতে হয়। বাংলাদেশের জেলাভিত্তিক সাইটগুলো একযোগে ও সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট হ্যাকিং এর ঘটনাও রয়েছে।

গত বছরে যেনো হ্যাকিংয়ের ডায়রিয়া বয়ে গেছে। কি ‌’হ্যাকিংয়ের ডায়রিয়া” শুনে অবাক হচ্ছেন! কারণটা বলি গতবছর একটি নাটকে বলতে শুনেছিলাম, যেটি বেশি পরিমানে ঘটে সেটি হচ্ছে ডায়রিয়া। :-পি… তাই হ্যাকিংয়ের ঘটনা বেশি বেশি হওয়ার এর ডায়রিয়া হয়েছিলো বলে ভাবলে মনে হয় দোষের কিছু নেই। গত বছরে বাংলাদেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কিছু না করতে পারলেও হ্যাকিংয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছে। এক সাথে ৭০০ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হ্যাক। চারটে খানি কথা নয়! গত সেপ্টেম্বরে হ্যাকারগ্রুপ ‘টাইগার-মেট’ এই হ্যাকিং ঘটায় বলে প্রমানিত হয়। এর বাইরে প্রযুক্তিখাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সনির ওয়েবসাইট ধারারবাহিকভাবে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে। হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানটির প্লেস্টেশন নেটওয়ার্ক ও সনি এন্টারটেইনমেন্ট নেটওয়ার্ক ও সনি পিকচারের প্রায় ১০ লাখের অধিক ব্যবহারকারীর ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ড তথ্যসহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য চুরি করে নেয়। টানা তিনবার হ্যাকিংয়ে বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে সনি। এতে গ্রাহকদের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়াও তাদেরকে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরন দিতে বাধ্য হয়েছে সনি। বিপর্যয় কাটিয়ে ফিরে দাড়াতে অনেক বেগ পোহাতে হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে অনলাইনে গেম বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্টিম’ নেটওয়ার্কে আক্রমণ চালিয়েছে হ্যাকাররা। কল অব ডিউটি এবং স্কাইরিমসের মতো জনপ্রিয় গেমের এই পরিবেশক প্রতিষ্ঠানটির ডাটাবেজে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে তারা। এর ফলে সাড়ে তিন কোটি গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গতবছর হ্যাকিংয়ের তালিকায় আরো উল্লেখযোগ্য ছিল গুগলের মেইল সেবা জিমেইল, ইউটিউব চ্যানেল সিসেম স্ট্রিট, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এইচবিজিঅ্যারে, কচ-ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্যাংক অব আমেরিকা, ন্যাটোসহ বেশ কিছু সরকারি বেসরকারি ওয়েবসাইট। সর্বশেষ আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সে হ্যাকাররা হামলা চালায়। আর এসব হ্যাকিংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত হয় হ্যাকার গ্রুপ লুলজ সিকিউরিটি [লুলজসেক]। বাংলাদেশের টাইগার মেটের পর বছরের সবচেয়ে বেশি ও আলোচিত ওয়েবসাইটগুলোর হ্যাকিংয়ের পিছনে ছিল তারা। এছাড়া আলোচনায় আসে অপর হ্যাকার গুপ লুলজর‌্যাপ্ট,পিপলস লিবারেশন ও টিমপয়জন। আর এসব হ্যাকিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার কোটি ডলার ক্ষতিগ্রস্থ হতে হয়েছে।

গতবছরের ধারাবাহিকতা রয়েছে এবছরের প্রথম থেকেই। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুক বছরের প্রথমে হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে আলোচনায় আসে। প্রায় ৪৫ হাজার গ্রাহকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করে নেয় হ্যাকাররা। তবে বাংলাদেশিদের জন্য আশার কথা হলো এসব গ্রাহকদের বেশিরভাগই যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের অধিবাসী। সর্বশেষ গত শনিবার বছরের প্রথম বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে অনলাইনে জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান জ্যাপ্পস। হ্যাকাররা প্রায় আড়াই কোটি গ্রাহকের তথ্য চুরি করে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাহকের নাম,ইমেইল ঠিকানা,বসবাসের ঠিকানা,ফোন নম্বর,ক্রেডিট কার্ড নাম্বারের শেষের চার সংখ্যা ও পাসওয়ার্ড।

এবছরের প্রথমদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নামক সরকারি ওয়েবসাইটটি হ্যাক হতে দেখা গেছে। যার কারণে অনেকেই বছরের প্রথমে ডিজিটাল বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে সরকারি ওয়েবসাইট ভিজিট করতে গিয়ে হতাশ হয়েছেন।

গতবছর লুলজসেক দাবি করেছিলো, আমরা সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সাইটের দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর জন্য হ্যাক করছি। এ থেকে বোঝা যায় সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিভাবে অযতনে, নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রাখে! তারপরেও বোধদয় হয়না। বিশ্বের নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোর হয়না, আমাদের বাংলাদেশের কথা ভাবাতো দুরের ব্যাপার।

কিন্তু আমরা কি চাই, আমার গুরুত্বপূর্ণ ক্রেডিট কার্ডের তথ্য অন্য কেউ চুরি করে স্বার্থ লুফে নিক? কখনোই না। দেশি-বিদেশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বোধদয় হবে কবে? আদৌ হবে কি?….

comments

9 কমেন্টস

  1. অনেক কিছুই জানলাম… যদিও ছোটখাট হ্যাকার হবার সখ আছে… তারপরেও যেই দেশে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা বজায় রাখতে সরকার সমর্থ হচ্ছে নাহ সেখানে ওয়েবসাইট নিয়ে ভাবার সময় কোথায় সরকারের!! তবুও কিছু কিছু মানুষ এই নিয়ে কাজ করছে। তাই আমরা আশায় রইলাম। ধন্যবাদ আপনাকে

    • মানুষের জানমালের সাথে সাথে যদি সরকার ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিয়ে না ভাবে তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন বা রক্ষা হবে কি করে। কারণ এই ওয়েবসাইটই ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের একটি ভিত্তি। কাগজের পরিবর্তে তথ্য যদি ওয়েবসাইটে/সার্ভারে না রাখা হয় তাহলে কি করে ডিজিটালি সেটা সরবরাহ করা সম্ভব হবে? তাই হ্যাকিং প্রতিরোধে সরকারের অনেকই করনীয় আছে। আপনাকে ধন্যবাদ পোস্টটি পড়া ও মন্তব্য করার জন্য।…:smile::smile:

  2. ভাল মন্দ নিয়েই জগৎতা চলছে। তবে, কেউ যদি নিজের নিরাপত্তা থৈরী করে নিতে না পারে তাহলে সে ব্যর্থ। কারন, হিংস্র পশুরা নিরীহ প্রাণীদের সামনে পেলে তাদের স্বীকার করবে এটাই স্বাভাবিক! ::!:

    • সেটাই! কিন্তু ক’জন সেটা করে। ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিয়েই বা ক’টা প্রতিষ্ঠানই সচেতন? খুবই কম প্রতিষ্ঠান। তারপরেও সরকারি ওয়েবসাইটগুলো বেশি হ্যাক হয়। তাই এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তবে জানতে পারলাম সরকারি প্রায় সব ওয়েবসাইটই নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে এবং এর নিরাপত্তার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। এবার ব্যক্তি উদ্যোগে এগিয়ে যাওয়ার পালা…

  3. ভুল নাম্বার 1
    কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করা এবং স্বীয় স্বার্থ উদ্ধার করা এটা ভূল ধারনা কারন হ্যাক্রের প্রকারভেদ আছে সবাই স্বীয়স্বার্থ উদ্ধার করেনা
    ভূল নাম্বার দুই
    টাইগারমেট ৭০০ নয় ৭ লাখ করেছে 😛

    • ধন্যবাদ মেজবাহ… প্রথমটা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও পরেরটা নিয়ে বিতর্ক করতে চাইনা। কারণ এখানে সংখ্যার ভুল হয়েছে আমার। জাস্ট টাইপিং এরর। 🙁
      প্রথমটির ক্ষেত্রে বলতে হয়, যারা হ্যাকিং করেন তারা অন্যের জন্য সহায়ক কিছু (হ্যাকিং) করলেও সেখানে তার স্বীয় স্বার্থ থাকে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.