সৈয়দ কাউসার আহমেদঃ তামাকের সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। সিগারেট এবং এজাতীয় নেশামূলক দ্রব্যের মূল উপাদান হিসেবে কাজ করে তামাকে নিকোটিন এবং টার। কিন্তু তামাক কি শুধু মানবজাতির ক্ষতির কারণ হিসেবে থাকবে? এর কি কোন উপকারী দিক নেই?

এই প্রশ্নের উত্তর খুজে বেড়িয়েছেন একদল গবেষক এবং দীর্ঘমেয়াদী এই গবেষণায় অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছেন তারা যা কিনা তামাক সম্পর্কে গোটা ধারণাই পরিবর্তন করে দিয়েছেন।

12939310_1703335493217218_585807425_n

তাদের অভিমতে তামাক হতে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্ভিদ। তামাক থেকে আমরা পেতে যাচ্ছি অতি উন্নতমানের জৈব জ্বালানি একই সাথে প্রচুর পরিমাণে পশুখাদ্য এবং বায়োম্যাস। পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে জৈব জালানি, পশুখাদ্য এবং বায়োম্যাস এর মুল্য এবং গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি।

তামাকের এই জৈব জ্বালানির মূল উৎস হচ্ছে এর বীজ এবং বড় বড় পাতা যা শুকিয়ে এবং পরে গুড়া করে পিষে এই তেল পাওয়া যায় যা খুবই উন্নতমানের জ্বালানি।

তামাক গাছের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ইহা একই জমিতে বছরে ৩-৪ বার চাষ করা যায় এবং এর ফলন এবং উৎপাদন এর পরিমাণ অনেক বেশি।

তামাকের ফলন ব্যাপক। এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করে প্রায় ৩ টন তেল পাওয়া যায়, প্রায় ৬ টন পশুর খাদ্য পাওয়া যায় এবং প্রায় ৪৫ টন এর মত বায়োম্যাস পাওয়া যায় যা পুনরায় শক্তি উৎপাদন এর কাজে ব্যবহার করা যাবে। যে কোন তেলজাতীয় উদ্ভিদের তুলনায় এই ফলন ঈর্ষনীয়।

আমেরিকায় জৈব জ্বালানি হিসেবে সবচেয়ে প্রচলিত হল ভুট্টা। ভুট্টার গাঁজন প্রক্রিয়া মাধ্যমে সেখান থেকে ইথানল পাওয়া যায় যা গ্যাসোলিনের সাথে মিশানো হয় এতে করে গ্যাসোলিনের জ্বালানি ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তামাকের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে তামাক থেকে জৈব জ্বালানি তৈরি করার জন্য গবেষকরা শৈবাল ও স্যায়ানোব্যাকটেরিয়ার জিন ব্যবহার করেছেন, যার ফলে এসব জিন তামাক পাতায় সূর্যের আলো ব্যবহার করে সরাসরি হাইড্রোকার্বন তৈরি করে। যদিও তামাকের বিপাকীয় কাজেই পাতায় স্বাভাবিকভাবে তেল সঞ্চিত হয় কিন্তু শৈবাল ও স্যায়ানোব্যাকটেরিয়ার জিন ব্যবহার করার ফলে এর তেল সঞ্চয়ের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। তামাক তার পাতায় ফটোসিনথেসিস এর মাধ্যমে এই তেল তৈরি করে থাকে যা প্রাকৃতিক এবং পরিবেশগত দিক দিয়ে কোন ক্ষতির কারণ নেই। ভুট্টার তুলনায় তামাক থেকে এভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদন অনেক সহজ এবং কার্যকরী। পাতায় সঞ্চিত এই তেল হচ্ছে অশোধিত এবং যা দীর্ঘদিন পাতা সঞ্চিত অবস্থায় থাকতে পারে। এই অশোধিত তেল থেকে মাত্র কয়েকটি ধাপেই জ্বালানি তেল নিষ্কাশন করা যায়। মূলত ইথানল তৈরি করতে যে কয়েকটি ধাপ ও যন্ত্রপাতির দরকার হয় তার চেয়ে অনেক কম ধাপে এবং সহজ উপায়ে তামাক গাছ থেকে এই জ্বালানি তেল পাওয়া যায়,যা বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় করে এবং সময় বাঁচায়। আর তামাক পাতা থেকে প্রাপ্ত এই জ্বালানি তেল গ্যাসোলিন এর তুলনায় অধিক উন্নত এবং কার্যকরী জ্বালানি।

লরেন্স বেরক্যালি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিসনেস ডেভলোপমেনট স্পেশালিষ্ট বিল শেলেনডার বলেন “যে সকল উপাদানের জন্য তামাক খারাপ তা জ্বালানি হিসেবে খুবই ভাল” তিনি আরো বলেন “আপনি যখন ধূমপান করেন তখন আপনি মূলত টার এবং নিকোটিন পান করেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। সাধারণত তামাকে টার এর পরিমাণ অনেক বেশি এবং এটি এমন এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান যা খুব সহজেই জ্বালানীতে রূপান্তরিত করা যায়,বলা যায় তেলের মাতৃ উপাদান এটিই। শুধু তাই নয় তামাক গাছ যদি দীর্ঘদিনের জন্য মাটির নিচে পুতে ফেলা হয় তবে তা একটি বিশাল তেলের খনিতে পরিণত হবে।”

12935224_1703335539883880_974955444_n

লরেন্স বেরক্যালি ল্যাব এর সাথে বেরক্যালি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যানটুকি বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে পরিবর্তিত তামাক তৈরির কাজে করছে যাতে করে পাতায় প্রচুর পরিমাণে তেল সঞ্চিত হয়।

গবেষকরা স্যায়ানোব্যাকটেরিয়া এবং শৈবাল থেকে কিছু জিন নিয়ে তামাকের পাতায় ব্যবহার করেছেন যাতে করে অধিক পরিমাণে তেল পাওয়া যায়।

আবার তামাক গাছকে জৈব শক্তির উৎস হিসেবে পরিণত করার উপর আরও একদল বিজ্ঞানী একটি প্রজেক্টের উপর কাজ করে যাচ্ছেন, যা সোলারিস প্রজেক্ট নামে পরিচিত, এটি মূলত ইটালিয়ান একটি কোম্পানি শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল, তামাক পাতায় যে পরিমাণ তেল পাওয়া যায় তেমনি যেন এর বীজেও তেল পাওয়া যায় কারণ বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন করা পাতা থেকে তেল নিষ্কাশন করা অধিক সহজতর।

মূলত তামাক গাছের পাতা ও বীজ থেকে তেল,পশুখাদ্য এবং বায়োম্যাস পাওয়া যায়।

তামাক গাছ থেকে প্রাপ্ত তেল জেট বিমানের জ্বালানি তেল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে ডিজেল এবং গ্যাসোলিন এর পরিবর্তে কারণ এটি এদের চেয়ে উৎকৃষ্ট জ্বালানি। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হয়। কারণ তামাক তেল থেকে প্রাপ্ত তেলের ফ্রিজিং এর সময় ঘনত্ব এবং তারল্যে জেটের জ্বালানির জন্য খুবই উপযুক্ত এবং এখনই টাম্বো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে বিমানের জ্বালানীর প্রায় ৫০ শতাংশ এখনই তামাকের তেল ব্যবহার করা হয়।

তামাক গাছের পাতা এবং বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন করার পর এখান থেকে বিপুল পরিমাণ পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় কারণ এখানে আর নিকোটিন বা টার থাকে না যার ফলে তা প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকারক নয়। শুধু তাই নয়, এই পশুখাদ্য আবার বায়োম্যাস আবার বায়োগ্যাস তৈরির কাজেও ব্যবহৃত হয়।

ডক্টর জিহং লিউ কালার্ক,যিনি বায়োফর্ক,নরওয়েগণ প্রতিষ্ঠানটির কৃষি ও পরিবেশ গবেষণায় জড়িত এবং বায়োবুষ্ট গবেষণা প্রজেক্টের একজন মূল গবেশক। তিনি আরও বলেন “গাছ কার্বন-ডাই অক্সাইড এবং সূর্যের আলোর শক্তি ব্যবহার করে এনজাইম তৈরি করে যা পরক্ষাগারে তৈরির চেয়ে সহজ এবং পরিবেশ বান্ধব এবং অন্যান্য তেলজাতীয় গাছের তুলনায় তামাক গাছ অধিক উপযুক্ত কারণ এর পাতা অনেক বড় এবং এর থেকে প্রচুর পরিমাণে বায়োম্যাস পাওয়া যায়,শুধু তাই নয় এটি খুব দ্রুত জন্মায় এবং বৃদ্ধি পায় এছাড়াও বছরে ৩-৪ বার চাষ করা যায়।এখন তামাক গাছে কিছু জিন ব্যবহার করা হয় যাতে অধিক এনজাইম পাওয়া যায় এবং এই সকল এনজাইম পুনরায় প্রাপ্ত বায়োম্যাস সংশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়।

সুতরাং তামাকের এই ধরণের ব্যবহার করা গেলে একই সাথে ব্যাপক অর্থনৈতিক লাভ এবং বিপুল কর্মসংস্থান এর সৃষ্টি হবে।

পরিবেশগত দিক দিয়ে কার্বন শোষণ থেকে শুরু করে মাটির গুনাগুণ অক্ষুণ্ণ রাখা এবং পশুপাখির খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারবে এই তামাক গাছ।

এবং একই সাথে বায়োগ্যাস এর মত শক্তি উৎপাদন সংশ্লিষ্ট কাজেও ব্যবহার করা যাবে যা মানব কল্যাণে বিরাট ভূমিকা পালন করবে।

জৈব জ্বালানি ব্যবহারের এই তত্ত্বটি যদিও নতুন নয় তথাপি সাম্প্রতিক সময়ে এর বেশ জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিছু কারণে তন্মধ্যে গ্যাসোলিন এবং অন্যান্য জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানীর তেলের ঘাটতি ও কার্বন নিঃসরণের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়।এসব কারণেই এখন জৈব জ্বালানীর প্রচুর চাহিদা আর উৎকৃষ্ট জৈব জ্বালানি হছে তামাক। আশা করা যায়, খুব শিগ্রই বাণিজ্যিকভাবে তামাক থেকে প্রাপ্ত তেলের ব্যবহার শুরু হয়ে যাবে।

লেখকঃ  শিক্ষার্থী, বায়োটেকনলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here