বায়োগ্যাস প্লান্ট এক ধরনের সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। আর বিকল্প শক্তি উৎসের সন্ধানে এই বায়োগ্যাস প্রযুক্তি হতে পারে আমাদের দেশে আশীর্বাদস্বরূপ। সাশ্রয়ী প্রযুক্তির এই বায়োগ্যাস প্লান্ট এর বিস্তৃতি ও প্রসার আমাদের দেশের জন্য ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম। এই পরিবর্তনই আমাদের দেশে সাফল্য বয়ে আনবে নি:সন্দেহে!

শহরাঞ্চলে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে জ্বালানী হিসেবে খড়-কুটা ও কাঠ এবং অন্যান্য জ্বালানী ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে চমক সৃষ্টি করেছে বায়োগ্যাস প্লান্ট। এই প্রযুক্তি রান্না-বান্না ছাড়াও ঘর-গৃহস্থালীতে আলো এনে দিয়েছে।

বিভিন্ন দেশে বায়োগ্যাস প্লান্টের ব্যবহার
বিভিন্ন দেশে বায়োগ্যাস প্লান্টের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের প্লান্ট থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে কলকারখানা এবং গৃহস্থালী কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে চীন সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ও নেপালে বায়োগ্যাসের প্রচলন রয়েছে।

বাংলাদেশে বায়োগ্যাস প্লান্ট
আমাদের দেশে জ্বালানি সংকট থাকা সত্ত্বেও এবং এই সমস্যার সমাধানে এত ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তেমনভাবে এর প্রসার ঘটেনি। বাংলাদশে বিজ্ঞান ও গবেষণা পরিষদের জ্বালানি গবেষণা ও গোড়ার ইনস্টিটিউট এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে অনেক বছর ধরে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১০ একটি তথ্যে জানা গেছে, অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানী লিমিটেড (ইডকল) নেদারল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ও জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় সারা দেশে ইতিমধ্যে প্রায় ১৪ হাজার বায়ো গ্যাস প্লান্ট তৈরি করা হয়েছে। ইডকল সারাদেশে ৩২ হাজার ২৬৯টি বায়ো গ্যাস প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

বায়োগ্যাস প্লান্ট কী
আসুন এবার জেনে নিই বায়োগ্যাস প্লান্ট কী? মূলত: পচনশীল পদার্থ যেমন গোবর, বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ ও অন্যান্য জৈব পদার্থ বাতাসের অনুপস্থিতিতে পচানোর ফলে যে জ্বালানি গ্যাস তৈরি হয় তা বায়োগ্যাস প্লান্ট হিসেবে পরিচিত।

বায়োগ্যাস প্লান্টের উপাদান
প্রকৃতপক্ষে বায়োগ্যাস প্লান্টের উপাদান হচ্ছে যে কোনো পচনশীল পদার্থ। যথা;
ক) গোবর
খ) বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ
গ) গাছ-পালা ও লতা-পাতা
অর্থাৎ পচনশীল পদার্থই বায়োগ্যাস প্লান্টের উপাদান।

জ্বালানী গ্যাস ও জৈব সার উৎপাদান
এই বায়োগ্যাস প্লান্ট হতে ৬০/৭০ ভাগ জ্বালানি গ্যাস উৎপাদন করা যায়। গ্যাস উৎপাদন ছাড়াও এতে অবশিষ্ট অংশ থেকে উন্নতমানের জৈবসার উৎপাদিত হয়। এ ধরনের বায়োগ্যাস প্লান্ট হতে জ্বালানী উৎপাদিত হচ্ছে এমন প্লান্টসমূহ পর্যালোচনা করে জানা গেছে, অন্যান্য যে কোনো সার অপেক্ষা এ ধরনের জৈবসার অনেক বেশি কার্যকরী। এই জৈব সার দিয়ে বেশি ফসল উৎপাদন করা যায়।

বায়োগ্যাস প্লান্টের জন্য ৫-৬ টি গরুর প্রতিদিনের গোবর থেকে প্রায় ১০৫ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। এই গ্যাস দিয়ে ৭-৮ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের জন্য তিন বেলার রান্না-বান্না সহ একটি ম্যান্টেল বাতি জ্বালানো যাবে।

বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরির পদ্বতি
১) প্রথমে ২৫০ সে. মি. ব্যাস এবং ২২০ সে. মি. গভীর একটি গোলাকার কূপ খনন করতে হবে।
২) এই কূপের তলদেশ চাড়ির তলার আকৃতিতে খনন করতে হবে। এতে তলার মধ্যবিন্দু থেকে আর্চের উচ্চতা ৩০ সে. মি. (১ ফুট) হয় এর পর তলদেশে ভালো করে দুরমুজ করে নিতে হবে।
৩) তলদেশে ৭.৫ সে. মি. পুরু ইট বিছিয়ে দিতে হবে।
৪) এই সোলিং-এর ওপর ১:৩:৬ (সিমেন্টঃ বালুঃ খোয়া) অনুপাতে ৫ সে. মি. পরু ঢালাই দিতে হবে।
৫) ঢালাই এর ওপর ২১০ সে. মি. ব্যাস (ভিতরে রেখে গোলাকৃতি ১২.৫ সে. মি. ইটের দেয়ালের গাঁথুনি করতে হবে।
৬) দেয়ালের উচ্চতা যখন ২৫ সে. মি. হবে তখন কুয়ার একদিকে হাইড্রলিক চেম্বারের মুখের জন্য ১৫০ সে. মি.× ৭৫ সে. মি. এবং অন্যদিকে ইনলেট পাইপ বসানোর জন্য ২০×২৫ সে. মি. গাঁথুনি খোলা রাখতে হবে।
৭) ১৫ সে. মি. ব্যাসবিশিষ্ট একটি আরসিসি পাইপ (ইনলেট পাইপ) দেয়ালের সঙ্গে আনুমানিক ৩০ ডিগ্রি কোণ রেখে বসিয়ে নিতে হবে।
৮) দেয়ালের কাজ মোট ১০০ সে. মি. হলে হাইড্রলিক চেম্বারের দরজার কাজ শেষ হবে। দেয়ালেরকাজ পুনরায় শুরু করে হাইড্রলিক চেম্বারের মুখের উপরিভাগ থেকে ৪০ সে. মি. পর্যন্ত গেঁথে নিতে হবে।
৯) এখন দেয়ালের উপরিভাগে ১:২:৪ অনুপাতে ৭.৫ সে. মি.পুরু ঢালাই দিতে হবে।
১০) এই ঢালাই-এর ওপর ৭.৫ সে. মি. পুরু ইটের গাঁথুনি দিয়ে ৬০ সে. মি. আর্চ উচ্চতাবিশিষ্ট গম্বুজ আকৃতির ডোম তৈরী করতে হবে।
১১) ডোমের উপরের অংশে গ্যাস নির্গমনের জন্য একটি ১.২৭ সে. মি. ব্যাসবিশিষ্ট ২৫ সে. মি. লম্বা জিআই পাইপ খাড়াভাবে স্থাপন করতে হবে। জিআই পাইপের উপরি অংশে একটি গ্যাস ভাল সংযুক্ত করতে হবে।
১২) এখন দেয়ালের ভিতরের অংশে নিচ থেকে হাইড্রলিক চেম্বারের মুখের উপরিভাগ পর্যন্ত ১:৪ অনুপাত ১.২৭ সে. মি. পুরু প্লাস্টার করতে হবে।
১৩) হাইড্রলিক চেম্বারের মুখের উপরি ভাগ তেকে ডোমের ভেতরের সম্পূর্ণ অংশ ১:৩, ১:২, ১:১ অনুপাতে তিনবার প্লাস্টার করতে হবে।

বায়োগ্যাস প্লান্ট চালু করণ
বায়োগ্যাস প্লান্ট চালু করার সময় ১.৫/২ টন কাঁচামাল যথা গোবর, অন্যান্য বর্জ্য, গাছের লতা-পাতা জাতীয় পচনশীল পদার্থের প্রয়োজন। প্লান্ট তৈরির শুরুর দিকে এগুলো জমা করে রাখলে প্লান্ট চালুর সময় এগুলো ব্যবহার করা যাবে। অবশ্য কেউ যদি ২/১ দিনেই উক্ত পরিমান কাঁচামাল যোগাড় করতে পারেন, তবে আগে থেকে জমা করে রাখার প্রয়োজন হয় না। জমাকৃত কাঁচামাল এবং পরিষ্কার পানি গোবরের ক্ষেত্রে ১:১ হাঁস-মুরগির মলের ক্ষেত্রে ১:৩ অনুপাতে মিশিয়ে ইনলেট পাইপ দিয়ে আস্তে আস্তে কূপে ঢালতে হবে। এই বায়োগ্যাস প্লান্ট চার্জ করার সময় প্লান্ট সম্পূর্ণ ভর্তি না হলে সেক্ষেত্রে বাকি অংশ পানি দিয়ে ভরে করতে হবে।

গ্যাস সরবরাহ
১.২৭/২.৫৪ সে. মি. চওড়া পিভিসি / জিআই পাইপ লাইন প্লান্ট থেকে চুলা, হ্যাজাক লাইট, জোনারেটর পর্যন্ত সংযোগ করতে হবে। যেহেতু বায়োগ্যাসে পানি মিশ্রিত থাকে, সেহেতু পানি জমে থাকার সম্ভবনা থাকবে না। পাইপের এক মাথা একটি প্লাস্টিক পাইপের সাহায্যে প্লান্টের সরবরাহ লাইনে এবং অন্য মাথাটি চুলা, হ্যাজাক, লাইট, জেনারেটর ইত্যাদির সাথে টি-এর সাহায্যে যুক্ত করে নিতে হবে।

আমাদের দেশে প্রথমদিকে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিসরে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষত গৃহস্থালী কাজের জন্য অর্থাৎ রান্না-বান্না ও বৈদ্যুতিক কাজে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি অনন্য। এই প্রযুক্তি অর্থনৈতিকভাবে অনেক সাশ্রয়ী অর্থাৎ কম খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়। তাছাড়া এটি পরিবেশের তেমন কোনোই ক্ষতি সাধন করে না; এটি পরিবেশ বান্ধব বটে!

নোটঃ এই পোস্টটি মাসিক টেকনোলজি টুডের সৌজন্যে। পোস্টের সরাসরি লিঙ্ক এখানে

comments

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.