মাছও যে মানুষের মতো সৌন্দর্য সচেতন এবং গ্রীষ্মকালে ত্বকের যত্নে সানস্ক্রিন ব্যবহার করে তা প্রমান করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন ভারতের বর্ধমানের মেয়ে স্বাগতা ঘোষ। ‘ব্লু প্রোটিন উইথ রেড ফ্লুরোসেন্স’ শিরোনামে স্বাগতা ঘোষসহ আট গবেষকের গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান-জার্নাল ‘পিনাস’-এ অক্টোবরে ছাপা হয়েছে।

আমাদের মধ্যে সবাই যেমন স্বাস্থ্য সচেতন নই, তেমনই সব মাছ নিজেকে বাঁচাতে সানস্ক্রিন ক্রিম বানিয়ে নিতে জানে না। কিছু বিশেষ প্রজাতির মাছের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তেমনই এক বিশেষ প্রজাতির মাছের নাম- ‘ওয়ালায়ি’। উত্তর আমেরিকার এক ধরনের ‘স্পোর্ট ফিশ’ যার বৈজ্ঞানিক নাম- ‘স্যান্ডার ভিট্রিয়াস’।

বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যেমন পার্থক্য দেখা যায় তেমন সব জায়গার ওয়ালায়ি মাছের গায়েই সানস্ক্রিন দেখা যায় না। একমাত্র উত্তর মেরুর কাছে কানাডার হ্রদগুলির পানিতেই গরমকালে সানস্ক্রিন দেখা যায় ওয়ালায়ি মাছেদের শরীরে। আবার তীব্র শীতে কানাডার ওসব এলাকায় ওয়ালায়ি মাছের গায়ে সানস্ক্রিনের রংটা আর অতটা গাঢ় নীল থাকে না, অনেকটা ফিকে হয়ে যায়।

অবাক করা বিষয় এই যে, কানাডার ওয়ালায়িদের এই বৈশিষ্ট্য উত্তর আমেরিকারই দক্ষিণ দিকে বা দক্ষিণ কানাডার ওয়ালায়ি মাছের মধ্যে নেই একদমই। সেখানকার ওয়ালায়ি কাঁচা সোনারঙা।

দু’বছর আগে বায়োলজিস্ট স্ক্যাফার দেখিয়েছিলেন, একটু একটু করে গরম পড়লে, সূর্যের তাপটা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকলে, সানস্ক্রিন ক্রিমের মতো এক ধরনের ব্লু পিগমেন্টে নিজেদের রাঙিয়ে নেয় কানাডার ওয়ালায়িরা। যত গরম বাড়ে, ততই নীলটা গাঢ় হতে থাকে। শীত পড়লে সে রং ফিকে হয়ে যায়।

বেঙ্গালুরুর ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস’-এ (এনসিবিএস) সিনিয়র রিসার্চ স্কলার হিসেবে কর্মরত স্বাগতা জানান, ‘বিষাক্ত আলট্রা-ভায়োলেট রে শুষে নিয়েই ওয়ালায়িরা বানিয়ে ফেলছে নীল রঙের পিগমেন্ট, যাতে আলট্রা-ভায়োলেট রে তাদের কোনও ক্ষতি করতে না পারে। উত্তর আমেরিকায় দূষণের মাত্রা তুলনামূলক কম বলে আলট্রা-ভায়োলেট রে’র ঝাপটা কম সইতে হয় সেখানকার ওয়ালায়িদের। তাই তাদের গরম কালে নীল রঙা পিগমেন্ট বা সানস্ক্রিন ক্রিম গায়ে মাখতে হয় না।’

তিনি বলেন ‘আমরা যা পেয়েছি তা আসলে প্রোটিন এবং বিলিভার্ডিনের ‘স্যান্ডার সায়ানিন’ নামের একটি জটিল জৈব যৌগ। এই প্রথম ওই প্রোটিন অণুর চেহারা বা ‘স্ট্রাকচার’ দেখা সম্ভব হয়েছে। আলট্রা-ভায়োলেট রে ওয়ালায়িদের গায়ের মিউকাসে থাকা অণুগুলিকেও ভেঙে ‘ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল’ বানায়, যা তাদের জীবনধারণের বিক্রিয়াগুলির মূল চালিকা-শক্তি। ওই অণুগুলি আলট্রা-ভায়োলেট রে’র তাপে ভেঙে টুকরো হয়ে গেলে আরও বিপন্ন হয়ে পড়ে ওয়ালায়িদের জীবন। গায়ের ব্লু পিগমেন্ট আলট্রা-ভায়োলেট রে থেকে কানাডার ওয়ালায়িদের বাঁচায়, অণুগুলিকে ফ্রি-র‌্যাডিক্যালে ভাঙতে দেয় না।’

স্বাগতার ব্যাখ্যায়, ‘আলোর বর্ণালীতে যে রঙের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি (লাল), তার কম্পাঙ্ক সবচেয়ে কম। ওয়ালাইয়িদের গায়ের মিউকাসের ব্লু পিগমেন্ট ‘স্যান্ডার সায়ানিন’ নীল বা বেগুনি রং শুষে নিচ্ছে আলট্রা-ভায়োলেট রে থেকে। আর বিকিরণের মাধ্যমে প্রকাশ করছে উজ্জ্বল লাল আলো। অর্থাৎ, শুষে নেওয়া আলট্রা-ভায়োলেট রে থেকে ওয়ালাইয়িদের গায়ের ব্লু পিগমেন্ট একটা বড় অংশের শক্তি শুষে নিচ্ছে। আর যে বাড়তি শক্তিটুকু তার দরকার নেই, তা লাল আলো বিকিরণের মাধ্যমে প্রজ্বলিত করছে মাছের শরীর।’

মূল গবেষক জানাচ্ছেন, স্যান্ডার সায়ানিন প্রোটিনের ব্যতিক্রম কিছু ধর্ম লক্ষ করা গেছে। এত ছোট আকারের লাল রঙের ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিনের সন্ধান এই প্রথম পাওয়া যায়। এটি হাই-ফোটোস্টেবিলিটি সম্পন্ন এবং ইনট্রিনসিক সেলুলার-ক্রোমোফোর। এই ধর্ম বা গুণগুলির জন্য ‘স্যান্ডার সায়ানিন’কে ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিন মার্কার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কাজে লাগানো যেতে পারে ‘ডিপ-টিস্যু ইমেজিং’-এ। অ্যালকোহলে আসক্তদের যে ‘গ্রিন জন্ডিস’ হয়, সেই রোগ নির্ধারণেও কাজে লাগানো যেতে পারে এই প্রোটিনটি।’

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.