দেশে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ইস্যু এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা সুসংহত করতে বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশে প্রচলিত অত্যাধুনিক কৌশল অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার স্ক্রিনিং সিস্টেম (এপিএসএস) যুক্ত করার কথা ভাবছে সরকার। এ প্রযুক্তি এপিআইএস (অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেম) হিসেবেও পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ পদ্ধতি জঙ্গি কর্মকা- প্রতিরোধসহ বিপজ্জনক যাত্রী শনাক্তকরণে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর আদলে প্রাথমিকভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই বিশেষ পদ্ধতি যুক্ত করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন আমাদের সময়কে বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বছরখানেক আগেই বিমানবন্দরগুলোয় এপিআইএস বা এপিএসএস যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে ইমিগ্রেশন পুলিশের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই তাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগির এ সিস্টেম চালু করা হবে।

ইতোমধ্যেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা অধিকতর জোরদার করা হয়েছে, জানিয়ে এ প্রসঙ্গে বেবিচক চেয়ারম্যান এহসানুল গণি চৌধুরী বলেন, হামলা বা নাশকতা এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এপিএসএস পদ্ধতি শিগগিরই চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় এ পদ্ধতি স্থাপন করা হতে পারে। অন্যথা বেবিচকের পক্ষ থেকেই এর ব্যবস্থা করা হবে।

দ্রুত এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। বলেন, শুধু আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগই নয়, একই সঙ্গে জনসচেতনতাও দরকার। কারণ আমাদের দেশের বিমানবন্দরে যাত্রীর স্বজনদের অনাকাক্সিক্ষত উপস্থিতি দেখা যায়। বিশ্বের অন্য দেশে এমন নজির নেই। এটিও দুষ্কৃতকারীদের অঘটন ঘটানোর অজুহাত সৃষ্টি করতে পারে।

জানা গেছে, গত অক্টোবরে রাশিয়ার একটি বিমান মিসরের শারম আল শেখ বিমানবন্দর থেকে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার পথে সিনাই উপত্যকায় বিধ্বস্ত হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার তাগিদ দিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। তাদের পে যুক্তরাজ্যের বিমান নিরাপত্তাবিষয়ক সরকারি দপ্তর নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ২০ দেশের ৩৮টি বিমানবন্দরের তালিকা তৈরি করেছে। এ তালিকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামও রয়েছে। এর জের ধরেই প্রথমে যুক্তরাজ্য, এরপর অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি বাংলাদেশের পণ্যবাহী বিমান সে দেশের বন্দরে সরাসরি অবতরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিষয়টি দেশের অর্থনীতির জন্য নেতিবাচকই শুধু নয়, দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমন বাস্তবতায় বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

দেশে সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) পাশাপাশি দুই প্লাটুন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিমানবন্দরের প্রবেশ গেট, হ্যাঙ্গার গেট, বিএফসিসি গেটসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর পয়েন্টে বিমানযাত্রীদের গাড়ি ও লাগেজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। জঙ্গি হামলাসহ যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি ঠেকাতে বিমানবন্দরে সার্বণিক মহড়া দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

মাত্র ৭ শতাংশ দেশ তাদের সীমান্ত রক্ষা ও দেশের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক বন্দরে এপিএসএস পদ্ধতি প্রয়োগ করছে না। এর মধ্যে বাংলাদেশও একটি।

এপিএসএস কী
অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার স্ক্রিনিং সিস্টেম (এপিএসএস) হচ্ছে সীমান্ত নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং যে কোনো দেশের সুরক্ষায় একটি নিবিড় নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল, আন্তর্জাতিক নৌবন্দর, আন্তঃদেশীয় স্থলবন্দর ও বিশ্বভ্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প, সরকারের সীমান্ত সুরক্ষা ও এ সংক্রান্ত নিরাপত্তা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা ও সেবা সংস্থার সহযোগিতায় এ পদ্ধতি কাজ করে।

প্রয়োগের পন্থা
এপিএসএস পদ্ধতি প্রয়োগে প্রধান উপাদান দুটি- এক. যাত্রীর আগাম তথ্য বা অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন (এপিআই) এবং দুই. যাত্রীর নামের নথি বা প্যাসেঞ্জার নেম রেকর্ড (পিএনআর)। আকাশ, জল বা স্থলপথে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণকারী প্রত্যেক যাত্রীর এসব তথ্য সীমান্ত সুরক্ষা ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আগাম সরবরাহ করা হয়। যাত্রী তার গন্তব্যের দেশে পৌঁছনোর আগেই প্রকৃত সময়ের ভিত্তিতে এ তথ্য সরবরাহ করা হয়।

অ্যালার্ম ও অ্যালার্ট পদ্ধতি সমন্বিত এসব আগাম তথ্য ওই যাত্রীর পরিচিতি, ঝুঁকি ও সম্ভাব্য হুমকির বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করে এবং যাত্রী ওই দেশে প্রবেশের আগেই কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে মূল্যবান সময় হাতে পায়।

ভ্রমণবিষয়ক বৈশ্বিক সংস্থা (আইএটিএ) ও বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান চলাচলবিষয়ক সংস্থার (আইসিএও) এপিআই-পিএনআর ওয়ার্ল্ড ট্র্যাকার রিপোর্ট ২০১৫-এ বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্বে ১৯৬টির মধ্যে ১৮৪টি দেশ ও সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো না কোনোভাবে এপিএসএস পদ্ধতি প্রয়োগ করে থাকে।

দেশে দেশে যে কারণে এপিএসএস ব্যবহার করা হয়
আগাম তথ্য, আগাম বিপদাশঙ্কা (অ্যালার্মস) এবং নিবিড় সতর্কতা পদ্ধতির পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণকারীদের ঝুঁকির ধরন বিশ্লেষণে সক্ষমতার কারণে এপিএসএস একটি দেশের সীমান্ত সুরক্ষার সামর্থ্য কার্যকরভাবে বৃদ্ধি করে এবং দেশটির আন্তর্জাতিক প্রবেশ ও প্রস্থানের পয়েন্টগুলোকে অধিকতর নিরাপদ করে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে ঝুঁকি আসার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানগুলো সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হ্রাস করা যায়।

বিশ্বব্যাপী ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসের নেটওয়ার্ক। চলমান এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে একটি দেশ ও এর সীমান্ত সুরক্ষায় এপিএসএসের প্রয়োজন অনস্বীকার্য বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.