মাত্র সাতজন কর্মী আর ৫০ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করা একটি প্রতিষ্ঠান আজ ৫ হাজারের বেশি দক্ষ পেশাজীবী নিয়ে ৮০টি দেশে সেবা দিচ্ছে — এটাই বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় সাফল্যের গল্প। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিটোপিয়া গ্রুপের এই যাত্রা, যারা এখন শুধু আউটসোর্সিং নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ এন্টারপ্রাইজ AI কোম্পানি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।

মাত্র সাত বছরে প্রতিষ্ঠানটি ২২টি ভিন্ন ব্যবসায়িক ইউনিট নিয়ে একটি বড় কনগ্লোমারেটে রূপ নিয়েছে, যার বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার — বাংলাদেশি টাকায় যা ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি।

ফ্রিল্যান্সিং থেকে গ্রুপ অব কোম্পানিজ

প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মনির হোসেন ২০০৬ সালে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (DUET)-এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পর শেষ চাকরিটি হারিয়ে তিনি ফ্রিল্যান্সিংয়ের দিকে ঝোঁকেন — oDesk এবং পরে Elance-এ বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ করতে শুরু করেন, একা হাতে।

চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে তিনি একটি দল গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে একক ফ্রিল্যান্সিং থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরিত হন। ২০১৭ সালে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি ও সাতজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করে Bdcalling IT, যার মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের উচ্চমানের প্রযুক্তি সেবা দেওয়া।

💡 সংক্ষেপে বিটোপিয়া গ্রুপ

৭ কর্মী থেকে ৫,০০০+ পেশাজীবী

২০১৭ সালে ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু, এখন ২২টি ব্যবসায়িক ইউনিট, ৮০টি দেশের ক্লায়েন্ট এবং ৫টি দেশে অফিস নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিটোপিয়া গ্রুপ।

বর্তমানে বিটোপিয়া গ্রুপের সদর দপ্তর ঢাকায়, আর যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে রয়েছে তাদের কার্যক্রম। বড় ও উন্নত বাজারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত করার পর প্রতিষ্ঠানটি এখন আফ্রিকার দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে, যেখানে ইতিমধ্যে একটি আফ্রিকান দেশের সরকারের সাথে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মনির হোসেন।

এক প্ল্যাটফর্মে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও কনসালটিং

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিটোপিয়া নিছক একটি সফটওয়্যার কোম্পানি নয়। অধিকাংশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ করে — সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, হার্ডওয়্যার সরবরাহ বা ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং। ফলে বড় পরিসরের এন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফরমেশনের জন্য ক্লায়েন্টদের একাধিক ভেন্ডরের সাথে কাজ করতে হয়, যা প্রায়ই বিলম্ব ও সমন্বয়হীনতার জন্ম দেয়।

বিটোপিয়া গ্রুপ এই তিনটি সেবাকে একটি একক সমাধানে একত্র করার দাবি করছে — সিস্টেম আর্কিটেকচার ডিজাইন থেকে শুরু করে অবকাঠামো স্থাপন, সফটওয়্যার তৈরি ও পরিচালনাগত সহায়তা, সবকিছুই একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে।

  • বাংলাদেশের একমাত্র অফিসিয়াল Odoo সিলভার পার্টনার হিসেবে কাজ করছে বিটোপিয়া লিমিটেড
  • Microsoft, AWS, Google Cloud, Dell, Cisco, HPE, Fortinet, Oracle ও Red Hat-এর সাথে যাচাইকৃত পার্টনারশিপ রয়েছে
  • ব্যবসায়িক ইউনিটের মধ্যে রয়েছে Softvence, Sparktech Agency, SM Technology, JVAI, Zenexcloud, Bdcalling, FIRE AI-সহ মোট ২২টি ভেঞ্চার

যুক্তরাষ্ট্রের ভেটেরান্সদের জন্য ডিজিটাল সমাধান

বাংলাদেশের বাইরে বিটোপিয়ার সক্ষমতার একটি বড় উদাহরণ VLARPRO — যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সামরিক সদস্যদের (ভেটেরান্স) জন্য তৈরি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্রের ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স বিভাগে প্রতিবন্ধী সুবিধার আবেদন প্রক্রিয়া এতটাই জটিল ও কাগজপত্র-নির্ভর যে অনেকেই মাঝপথে আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন।

বিটোপিয়া এই সমস্যার সমাধানে একটি মোবাইল অ্যাপ, ওয়েব পোর্টাল, সম্পূর্ণ ক্লেইম ওয়ার্কফ্লো ও নিরাপদ ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করে দেয় — যা সারা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিস্তৃত ও ব্যবহারযোগ্য একটি প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়। একই মডেল প্রতিষ্ঠানটি LegalTech, FinTech, EdTech, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন খাতেও প্রয়োগ করছে।

শুধু কথায় নয়, বাস্তবেই AI অবকাঠামো

এন্টারপ্রাইজ AI মূলধারায় আসার আগেই বিটোপিয়া GPU-চালিত কম্পিউটিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছিল বলে জানানো হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশেই তাদের এই AI অবকাঠামো সক্রিয়, যেখানে ইঞ্জিনিয়াররা NVIDIA-চালিত সিস্টেমে AI মডেল তৈরি, প্রশিক্ষণ ও ডেপ্লয় করছেন — যা মেশিন লার্নিং, এন্টারপ্রাইজ অটোমেশন ও পরবর্তী প্রজন্মের AI সমাধানে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৫০,০০০৳

২০১৭ সালের প্রাথমিক পুঁজি

২২

ব্যবসায়িক ইউনিট

৫,০০০+

কর্মী সংখ্যা

$36M

বার্ষিক টার্নওভার

বাংলাদেশ কীভাবে AI অর্থনীতির নেতৃত্ব দিতে পারে?

মনির হোসেনের মতে, বাংলাদেশের কাছে বিশ্বমানের প্রকৌশল প্রতিভা ইতিমধ্যেই আছে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি নীতিগত পরিবেশ তৈরি করা যেখানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক গতিতে উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা করতে পারে। তিনি তিনটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন:

  • বিশ্বমানের AI অবকাঠামো: AI হার্ডওয়্যারে উচ্চ আমদানি শুল্ক, দীর্ঘ কাস্টমস প্রক্রিয়া, অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চড়া আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ খরচ উদ্ভাবনে বাধা তৈরি করছে
  • বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ: ক্লাউড সেবা, সফটওয়্যার লাইসেন্স ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংগ্রহের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সহজলভ্যতা প্রয়োজন
  • ভবিষ্যৎ-উপযোগী দক্ষতা ও উদ্ভাবন: AI ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্লাউড আর্কিটেকচার, সাইবার সিকিউরিটি ও ডেটা সায়েন্সে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রম ও গবেষণা বিনিয়োগ প্রয়োজন
"বিশ্বমানের অবকাঠামো, আধুনিক নীতি আর ভবিষ্যৎ-উপযোগী প্রতিভায় বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশ এশিয়ার শীর্ষ AI অর্থনীতিগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।" — মনির হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, বিটোপিয়া গ্রুপ

বিটোপিয়া সিটি: দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন

বর্তমান কার্যক্রমের বাইরেও মনির হোসেনের রয়েছে আরও বড় এক স্বপ্ন — বিটোপিয়া সিটি নামে একটি বেসরকারি, প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শহুরে পরিবেশ গড়ে তোলা। এই পরিকল্পনায় একই জায়গায় থাকবে বিশ্বমানের ডেটা সেন্টার, বাণিজ্যিক ভবন, করপোরেট হেড অফিস, ইনোভেশন হাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক সুবিধা — যেখানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ইঞ্জিনিয়ার, উদ্যোক্তা ও গবেষকরা একসাথে কাজ করে একে অপরকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

২০৩০ সালের মধ্যে সরাসরি নিয়োগ ও ব্যাপক ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে হাজার হাজার বাংলাদেশি পেশাজীবীর জন্য প্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান তৈরি করাই তাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য।

উপসংহার

একটি সাত সদস্যের ছোট দল থেকে শুরু করে ৮০টি দেশে সেবাদানকারী একটি গ্রুপ অব কোম্পানিজ — বিটোপিয়ার এই যাত্রা প্রমাণ করে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা কতটা বিশাল। আউটসোর্সিং নির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি ও AI সমাধান তৈরির এই প্রচেষ্টা সফল হলে তা দেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনা হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS News) — রফিকুল ইসলাম, ১১ জুলাই, ২০২৬। মূল প্রতিবেদন পড়ুন এখানে