স্টেনলেস স্টিলউদ্ভাবনের ইতিহাস দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সাফল্য-ব্যর্থতা, সমকালীন প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার অদম্য স্পৃহায় সম্পৃক্ত সেই কাহিনি অতীব কৌতূহলোদ্দীপক ও মনোমুগ্ধকর। স্বল্প পরিসরে সেসবের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। তাই ক্রমবিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলোর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনাতেই সীমিত রাখতে হবে আমাদের এই ইতিহাস-চর্চা।

মরচে-রোধক ইস্পাত তৈরির দীর্ঘ ও দুষ্কর কর্মকান্ডের সূচনা হয়েছিল ইংল্যান্ডে। সালটা ছিল 1819। ছুরি, ক্ষুর, কাঁচি এসবের গুণমান উন্নত করার লক্ষ্যে নানা মিশ্র ধাতু (অ্যালয়) নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন মাইকেল ফ্যারাডে ও জেমস স্টোডার্ট।

লোহা আর ক্রোমিয়াম সহযোগে প্রস্তুত করেন ‘ফেরোক্রোম’। ক্রোমিয়ামের সংযুক্তি লোহায় ক্ষয়রোধক গুণ (করোশন রেজিসট্যান্স) বাড়ায় – এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি তাঁরাই সর্বপ্রথম তুলে ধরেন। এবং এভাবেই দিয়ে যান মরচে-রোধক মিশ্র ধাতু অন্বেষণের সঠিক পথের হদিস।

ফেরোক্রোমের ঠিক দু’বছর পর এল ক্রোমিয়াম স্টিল। ইস্পাতের সাথে ফেরোক্রোম মিশিয়ে জিনিসটা বানালেন ফরাসি মণিকবিদ্‌ বার্থিয়ের।
ভরের হিসেবে শতকরা 1.25 ভাগ ক্রোমিয়ামযুক্ত এই অ্যালয় দিয়ে যে ছুরি ও ক্ষুর তৈরি হল সেগুলি ছিল খুবই উন্নত মানের। বার্থিয়ের প্রত্যয়ের সাথে ঘোষণা করলেন, ছুরি, কাঁটা এসব ‘কাটলারি’ সামগ্রী বানানোর জন্য ক্রোম স্টিল খুবই উপযুক্ত উপাদান বলে বিবেচিত হবে।

লৌহ ধাত্রে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতির পরিণাম নিয়ে অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হলেন অনেকেই। কিন্তু গোল বাঁধল একটা ব্যাপারে। ক্রোমিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি করলেই দেখা দিত বিপত্তি। আসলে, সেই সময় ক্রোমিয়ামের সাথে অপদ্রব্য হিসেবে সর্বদাই মিশে থাকত কার্বন। বেশি মাত্রায় ক্রোমিয়াম বাড়িয়ে দিত কার্বনের পরিমাণও। বেশি কার্বনের উপস্থিতিতে ঘাতসহতা (ডাকটিলিটি) অত্যন্ত কমে যাওয়ায় মিশ্র ধাতুটি হয়ে পড়ত মাটির পুতুলের মতোই ভঙ্গুর।

মুশকিল আসান হল 1895 সালে। জার্মানির হান্স গোল্ডস্‌মিড কার্বনবিমুক্ত বিশুদ্ধ ক্রোমিয়াম নিষ্কাশনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন। ঘুচল কার্বন-ঘটিত ভঙ্গুরত্বের বাধা। গবেষণায় এল নতুন জোয়ার।

জার্মানিরই মোনার্টজ্‌ ও বোরচার্স 1911 সালে ক্রোমিয়ামের পরিমাণের সাথে ক্ষয়রোধক ক্ষমতার পারস্পরিক সম্বন্ধ নিরূপন করেন। এই গবেষণা থেকে জানা যায়, অন্যূন শতকরা 10.5 ভাগ ক্রোমিয়াম-সংযুক্তি মিশ্র ধাতুর ক্ষয়রোধক ক্ষমতায় আনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

স্টেনলেস স্টিল যুগের সূচনা

হ্যারি ব্রিয়ারলি (1871-1948)রিসার্চ মেটালার্জিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন শেফিল্ডের একটি গবেষণাগারে। ইস্পাতে বিভিন্ন পরিমাণ ক্রোমিয়াম সংযুক্তিকরণের ফলাফল খতিয়ে দেখছিলেন তিনি। উনিশশো তেরো সালের তেরোই আগাস্ট শতকরা 12.8 ভাগ ক্রোমিয়ামযুক্ত মিশ্র ইস্পাতের পিন্ড বানিয়ে রুটিন-মাফিক টেস্ট করার সময় ব্রিয়ারলি লক্ষ্য করলেন, জিনিসটায় মরচে-রোধক গুণ বর্তমান।

পাতিলেবুর রস, ভিনিগার সহ অনেক কেমিক্যালে ডুবিয়ে রেখেও কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত না হওয়ায় ব্রিয়ারলি প্রভূত বিষ্মিত হলেন।
ছুরি, কাঁটা, চামচ ইত্যাদি প্রস্তুতকারী শিল্পে (কাটলারি ইন্ডাস্ট্রি) এই মিশ্র ধাতুটি ব্যবহারের সম্ভাবনা যে অত্যন্ত প্রবল, তা উপলব্ধি করেছিলেন তিনি।

নাম নিয়ে একটি মজার ঘটনা জানিয়ে শেষ করব এই লেখা।
ব্রিয়ারলি চেয়েছিলেন মিশ্র ধাতুটির নাম হোক ‘রাস্টলেস স্টিল’। কিন্তু মিশ্র ধাতুটি দিয়ে কাটলারি প্রস্তুতকারী সংস্থার ম্যানেজারের বিপণন জ্ঞান ছিল বেজায় টনটনে। তিনি ভাবলেন, শুধু মরচে কেন, এতে তো পড়ে না কোনো দাগ-ছোপই। এই অভিনবত্ব আভাষিত থাকুক নামেও। ‘স্টেনলেস স্টিল’ নামটি তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত।
নামটি শ্রুতিমধুরও বটে। বলা নিষ্প্রয়োজন, চালু হয়েছে ম্যানেজারের দেওয়া সেই লাগসই (ক্যাচি) নামটাই।

@ R.K.RABBI
> রহস্যময় বিজ্ঞান জগত –
https://themswblog.wordpress.com/

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.