কার্ডিন-এর শরীরটা গত কয়দিন ধরে খুব খারাপ যাচ্ছে। এমনিতেই সারাদিন-রাত একটানা কাজ করে যেতে হয়, বিশ্রাম নেয়ার এতটুকু সময় পর্যন্ত নেই। তার উপর এখন আবার শরীরটাও খারাপ হওয়া শুরু করলো। আর বিশ্রাম নেবেই বা কেমন করে? ওর উপরে ভরসা করেই তো বেঁচে আছে পুরো রাজ্যটার প্রতিটা নাগরিক। আশেপাশের কারো উপর কোনো ক্ষোভ নেই কার্ডিন-এর। প্রতিবেশী লাংকিন, ব্রিকী, প্যানকি, লিভা্ন‌, গ্যাট্স, স্পীল সবাই কার্ডিনের অনেক কাছের, ছোট থেকে একসাথেই তো এত বড় হয়েছে ওরা। তাই ওদের কাউকে নিয়ে তেমন হিংসাও কাজ করে না কার্ডিন-এর। আর তাছাড়া ওরা সবাইও কার্ডিন-এর মতই দিনরাত খেটে মরে এই দেশটার জন্য। একঅর্থে ওরা সবাই মোটামুটি সমগোত্রীয়ই। হিংসা শুধু ওই এক রাজাকে নিয়েই, রাজার নাম- কিং ব্রেইলী। যে কিনা সারাদিন ওই পাহারটার উঁচুতে বসে থাকে রাজ্য, সিংহাসন আর কড়া নিরাপত্তার বেস্টনী নিয়ে , আমাদের পাঠানো খাবার-রসদ নিজে ভোগ করে আরামের সাথে আর আমদেরকে দিয়ে সারাটা বেলা খাঁটুনি করিয়ে নেয়। দু’চোখে সহ্য করতে পারেনা কার্ডিন রাজার এই স্বেচ্ছাচারিতা আর ভোগ-বিলাসীতা। ছোটবেলা থেকেই এর-ওর কাছে শুনে আসছে রাজার নাকি অনেক কাজ, পুরো রাজ্যের ভাইটাল ভাইটাল সব কাজই নাকি তার কথা ছাড়া একটুকু এদিক-ওদিক হয় না…! কার্ডিন বিশ্বাস করে না এটা, জীবনে নিজ চোখে দেখার-ই সুযোগ হলো না যাকে, সে নাকি আমাদের সবার জন্য নিবেদিত প্রাণ…!! সব ফালতু কথা। একদিন কাছে পেলে একচোট দেখে নিতাম রাজার কত তেল? ইশ, কেন যে রাজ পরিবারে জন্ম নিলাম না? প্রতিদিনের মত নিজের নিয়তিকে আরেকবার দোষারোপ করে নিজের কাজে আবার মন দেয় কার্ডিন। কার্ডিন-এর কাজ যে খুব একটা কঠিন তা না, তবে খুবই পরিশ্রমের কাজ। দেশের সমস্ত শহরে রসদ সাপ্লাইয়ের প্রধান কার্যালয় এই রাজধানীতেই, “The City Of Medisty”. সেই কার্যালয়ের প্রধান কার্ডিন সাহেব। দপ্তর-প্রধান হলেও তাকে অন্যান্য সাধারণ কর্মচারীর মতই শ্রম দিতে হয় রোজ। একটু ছাড় দিলেই কর্মচারীরা বেজায় লাই পেয়ে যায়, ভালো করেই জানে কার্ডিন। নিজের কাজে তাই কখনো গাফেলতি করেনা ও।

Brain

শুধু কার্ডিন কার্ডিন করছি। এবার একটু বাকিদের পরিচয় দেয়া যাক।

কার্ডিনের ফ্ল্যাট-এর পাশের বাসাটাই লাংকিন-এর। লাংকিনের সাথে ভালো পরিচয় থাকার কারণ হলো ওদের দুইজনের অফিস একখানেই আর প্রায় সবসময়ই একসাথেই থাকা হয় ওদের। দেশের “কাঁচামাল পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ” অধিদপ্তরে কাজ করে লাংকিন। এখান থেকে পরিশোধিত রসদ-গুলোই কার্ডিনের ওখানে পাঠানো হয় আর ওখান থেকে কার্ডিন সেগুলো সাপ্লাই করে পুরো দেশের প্রতিটা শহরে।

পাশের শহর “Abden City”তে থাকে লিভান, প্যানকি, স্পীল ,ব্রিকী আর গ্যাট্স-রা। ওই অফিসের কাজ নিয়েই ওদের সাথে পরিচয় কার্ডিনের। ওরা সবাই একেকজন রাজ্যের প্রধান প্রধান কার্যালয়গুলোর দপ্তর প্রাধান, কিন্তু কারো মাঝে কখনো কোনো ইগো কাজ করে না এটা নিয়ে, আর তাই হয়তো ওদের মধ্যে একটা গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। কিন্তু কার্ডিন-এর মত সবার মাঝেই একটা তীব্র ক্ষোভ আর ঘৃণা সেই একজনের উপর। হ্যা কিং ব্রেইলী…… স্বেচ্ছাচারী এই রাজার পতন একদিন দেখেই ছাড়বো-এই প্রতিজ্ঞা আর প্রতিক্ষা শুধু। সেজন্য দেশের জনগণের কাছে হয়তো দেশদ্রোহী বনে যেতে পারি, কিন্তু তা হবে সাময়িক, তবু রাজার মুখোশ খুলতেই হবে, জনগণের সামনে তুলে ধরতেই হবে রাজার আসল রূপ, আর এটা পারলেই তো পুরো দেশবাসীর কাছে হিরো হয়ে যাবো একেকজন…… ৭ বন্ধুর মনেই এখন এই এক স্বপ্ন।

গত দেড় মাস থেকে ৭ বন্ধু রোজ আলোচনায় বসে। না, কাজের আলোচনা না। আলোচনা অকাজের। আর আলোচনাও সামনাসামনি করে না ওরা। সব চলে চ্যাটিং-এর সাহায্যে। কিং ব্রেইলী-র সৈন্যদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এইসব দেশদ্রোহী টাইপ প্ল্যান-প্রোগ্রাম চালিয়ে যাওয়া বোকামী। ব্রেইলী ব্যাটা সারাদিন বসে থাকলেও তাঁর প্রাসাদের রয়্যাল ফোর্স, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী আর অন্যান্য সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের কর্মচারীরা ভিষণ অ্যাকটিভ আর দক্ষ্যও। ওদেরকে ভয় পাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এইতো গত বছরের যুদ্ধেই তো… ব্রেইলী সেনাবাহিনী তাদের দক্ষ্যতা আর নৈপুণ্যের যে নজিরটা রেখেছিলো, সেটার কথা মনে করলে আজও শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। সেই যে, কিং এ্যাথেরো-র গুপ্ত ঘাতক বাহিনী আমাদের শহরের প্রধান প্রধান ইন্ট্রেন্স রাস্তাগুলো ব্লক করে দেওয়া শুরু করেছিলো। আর তাতে রসদের সাপ্লাই সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ায় ওদিককার শহরগুলোর জনগণের তো প্রায় মারা যায় যায় অবস্থা। মাঠ-ঘাট শুকিয়ে চৌচির, আর রসদের সাপ্লাইএর প্রধান অফিস-ই তো হুমকি-র মুখে পড়ে গেছিলো। কার্ডিন তো ওইদিন ধরেই নিয়েছিলো সে শেষ, আর বাঁচার আশা বুঝি নাই। তখন একবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ব্রেইলী-র সৈন্যদের বীরের মত এগিয়ে আসা, নিজের জীবন বাজি রেখে কিং এ্যাথেরো-র সৈন্যগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া…সব নিজের চোখে দেখেছে কার্ডিন। কিন্তু দেখেনি শুধু রাজাকে। তার সৈন্যরা এদিকে নিজের জীবন বাজি রেখে লড়াই করে যাচ্ছে, আর সে কিনা এখনো প্রাসাদের আরামের বিছানায় শুয়ে শুয়ে তামাশা দেখছে!! লাখ লাখ সৈন্য প্রাণও দিয়েছিলো সেই যুদ্ধে, তবু সমবেদনা জানানোর জন্যেও একবার নেমে আসেনি প্রাসাদ থেকে। এ কেমন নিষ্ঠুর রাজা!! পরে সেই যুদ্ধে ঠিকই জয় হয়েছিল অবশ্য। যদিও পরে জানা গেছিলো বাইরের দেশের সাহায্য এসেছিলো নাকি। কোন দেশ যেন ‘স্ট্যাটিন’ নামের অনেক উঁচুমানের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিলো। যাই হোক, কিং ব্রেইলী-কে ধ্বংস করতে হবে, তাকে জবাবদিহী করতেই হবে দেশবাসীর সামনে।

স্পীল প্রতিরক্ষা বিভাগের মার্শাল এরিনার একটা শাখার চীফ। সেনাবাহিনীর নিউ রিক্রুটদের লাস্ট স্টেজ ট্রেইনিং এখানেই দেয়া হয়। এই স্টেজ পাস না হলে সেই রিক্রুট যুদ্ধের জন্য অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই সেই জায়গা যেখানে বৃদ্ধদের যারা দেশের কোনো কাজে লাগে না ধারণা করা হয়) তাদেরকে হত্যা করা হয়)। ব্রিকী না চাইলেও এই জঘন্য কাজটা সেই বছরের পর বছর করে যাচ্ছে। সব ঐ দুষ্টু রাজার আদেশ।

লিভান, গ্যাট্স, প্যানকি ওরা সবাই রসদ সংগ্রহ ডিপার্টমেন্টের সাথে জড়িত। আর ব্রিকী কাজ করত সিটি কর্পোরেশন ড্রেইনেজ সিস্টেম অধিদপ্তরে। সেও ওখানকার দপ্তর প্রধান। সমস্ত দেশের পানি নিষ্কাশন ও পরিশোধনের প্রধান সিস্টেম এখান থেকেই পরিচালিত হয়। কার্ডিন বেছে বেছে দেশের প্রধান প্রধান সিস্টেম গুলোর চীফদের নিয়েই তাই তার এই টীমটাকে সুসঙ্গত করেছে।

চ্যাট স্ক্রীনের সামনে বসা দলের সব মেম্বাররা- টীম লিডার কার্ডিন, এ্যাসিস্ট্যান ব্রিকী, আর বাকিরা (লাংকিন, লিভান, গ্যাট্স, প্যানকি আর স্পীল)। প্ল্যানিং প্রায় শেষের দিকে। সবার আগে গ্যাটস, লিভান আর প্যানকি যেটা করবে তা হলো- দেশের রসদ সংগ্রহের মেইন সিস্টেম পুরোপুরি ব্লক করে দেবে। মার্শাল এরিনায় স্পীল বন্ধ করে দেবে রাজসৈনিকদের ট্রেইনিং ইন্ট্রেন্স। এসিস্ট্যান্ট ব্রিকী বন্ধ করে দেবে ওয়াটার ড্রেইনেজ সিস্টেমের প্রধান ইংজিন। আর সব শেষে কার্ডিন ব্লক করে দেবে প্রাসাদে রসদ সরবরাহের মেইন রোড- “The Royal Way of Carotida”। ব্যাস, কিং-ব্রেইলীর রসদ বন্ধ, তারপর আর ঠেকায় কে, রাজা টের পাবে কত ধানে কত চাল। আজ মধ্যরাতেই শুরু হবে “অপারেশন ক্লীন ব্রেইলী”।

ভোর ৪টা। পুরো শহরে পিন-পতন নীরবতা। নিঃশব্দের ভয়ঙ্কর হাহাকারে ছেয়ে গেছে কিং ব্রেইলীর পুরো রাজ্য। কোথাও কোনো প্রাণের এতটুকু চিহ্ন পর্যন্ত নেই। যেন পুরো শহর চিরকালের জন্য ঘুমিয়ে গেছে কার যেন ঘুম পাড়ানি গান শুনতে শুনতে…… হ্যা, কার্ডিন চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে ঠিক বুঝতে পেরছিলো তারা কত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে। কিং ব্রেইলী মোটেই স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী আর বিলাসী কোনো রাজা ছিলো না। তার জন্যেই এতকাল নির্ঝঞ্ঝাট বেঁচে ছিলো এই রাজ্যের প্রতিটা প্রাণ। তাকে ছাড়া এই রাজ্যের একটা বালুকণারও সাধ্য নেই নিজের অস্তিত্বকে ধরে রাখার। জীবনের শেষ মুহুর্তটায় এসে আজ তার এই উপলব্ধিটুকু হলো যখন তার আর কিছুই করার নেই। তার আশেপাশের বন্ধু বলে যারা ছিলো তারা চিরতরে চলে গেছে কিছু ঘন্টা আগেই। মৃত্যুর নিঃসংশ ছোবল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে কিং ব্রেইলী কেও, অনেক আগেই, আর এখন প্রতীক্ষা করছে ওর জন্য। শেষবারের মত অনেক চেষ্টা করেছে কার্ডিন কিং ব্রেইলীর জীবন বাঁচাবার, কিন্তু পারেনি ও। উন্মাদের মত চিৎকার করে থামানোর চেষ্টা করেছে লাংকিন, ব্রিকী, প্যানকি, লিভা্ন‌, গ্যাট্স, স্পীল সবাইকে। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে, কিং ব্রেইলী ছাড়া যে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই সেটা উপলব্ধি করার সময়টুকুও পায়নি ওদের কেউ…… চিরতরে ঘুমিয়ে গিয়েছে মৃত্যুর কোলে।

আজ ২০১০। সেই করুণ আর নির্মম বিভিষীকাময় ঘটনার কথা আজো স্মরণ করে এই রাজ্যের প্রতিটা নাগরিক, আজ ঠিকই সেই ৭ বন্ধুর কথা স্মরণ করে তারা, তবে শ্রদ্ধা নিয়ে নয়, ঘৃণার সাথে। সেই ৭ জনের বোকামীর চরম মাশুল দিতে হয়েছিলো পুরো জাতিকে। আজ সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করার কথা চিন্তাও করে না এপ্রজন্ম। শান্তির এই রাজ্যটার প্রতিটা নাগরিক আজ জানে ওরা সবাই একে অপরের পরিপূরক, এখানে কেউ কারো শত্রু না, কেউ কাঊকে শোষণ করার জন্য না, বরং সহযোগীতার জন্য। সেই আগের পুরোনো অফিস, শহর, রাস্তাগুলো ঠিক আগের মতই আছে আজও, শুধু পালটে দেয়া হয়েছে দপ্তর প্রধানদের নামগুলো- হার্ট (কার্ডিন), লাংস(লাংকিন), Spleen (স্পীল), লিভার (লিভান), কিডনী (ব্রিকী), প্যানক্রিয়াস (প্যানকি), Guts/Intestine(গ্যাটস), ব্রেইন (কিং ব্রেইলী)। The City Of Medisty এখন  The Mediastinum, আর the Abden City-র নাম এখন  The Abdomen.  প্রাসদের যে মেইন রাস্তাটা ছিলো (The Royal Way of Carotida) ওটা এখন Carotid Artery (ক্যারোটিড ধমনী) নামে চেনে সবাই।

আর হ্যা, আরেকটা কথা- রাজা বলে কিছু নেই এখন, এই রাজ্যে এখন সবাই রাজা, আবার সবাই প্রজা। দেশদ্রোহী বা হিরো হবার কোনো স্বপ্নও কেউ দেখে না এখন। কারণ রাজ্যের প্রতিটা নাগরিক-ই এখন তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে একেকজন হিরো……

comments

3 কমেন্টস

  1. গল্পটি মজার কিন্তু নামটি বাংলায় হলে ভালো হতো না? ধন্যবাদ।

    • ধন্যবাদ মাইনুল ভাইকে 🙂
      হুম, বাংলায় দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এটা ছাড়া অন্য কিছু মাথায় আসছিলো না ওই সময়। ইংলিশ-এই চালিয়ে দিলাম।
      ঈদের শুভেচ্ছা রইলো। 🙂

  2. ৪ ভাগের ৩ ভাগ পড়ে মনে করে ছিলাম পুরোনোদিনের রাজা দের আমলের কোন সাইয়ে ন্সফিকশন গল্প হবে নিশ্চই। ভবিষ্যৎ থেকে কেউ টাইম মেশিন এ করে আসবে……… ইত্যাদি। আসলে সায়েন্স ফিকশনে সবই সম্ভব। যাই হোক শেষের অংশ পড়ে আমি বোকা হয়ে গিয়ে ছিলাম। তবে লিখাটি ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.