আমার নাম আশফাক আহমেদ। পেশায় বিজ্ঞানী। বাংলাদেশে আমার মত বিজ্ঞানী আর একটিও জন্মায়নি। আমি ২০৫৩ ও ২০৬৬ সালে দুইবার নোবেল পুরুস্কার পাই। আমার সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি হচ্ছে মৃত্যুর পরও মানুষের মস্তিষ্ক সচল রাখা। তবে এর একটি সীমাবদ্ধতা আছে। আমি মানুষের শুধু মস্তিষ্কটাকেই সচল করে রাখতে পেরেছিলাম। কিন্তু মানব দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গ নয়। আমি সর্বপ্রথম এটি একজন সাধারন নভোচারীর উপর প্রয়োগ করেছিলাম। সেই নভোচারী একটি দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। আমি তার মৃত্যুর পরও তার মস্তিষ্কটি সচল রেখেছিলাম। সারাবিশ্বে আমাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছিল তখন। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন আমার কপালে জোটেনি। ২০৭৩ সালের ১০ ই এপ্রিল অর্থাৎ আমার জন্মদিনেই আমার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছিল।

2010-10-23_191536

সেদিন ছিল শুক্রবার। সাধারণত এই দিনটির বেশিরভাগ সময় আমি আমার স্ত্রীর সাথে কাটাতাম। কিন্তু সেদিন হঠাৎই আমার মাথায় কিছু ফর্মূলা আসে। যেগুলোতে সফল হলে মানুষকে অমর বানানো সম্ভব। তাই ল্যাবরেটরিতে যাওয়ার জন্যে আমি ছটফট করছিলাম। আমার স্ত্রী গ্লোরি আমাকে বলল,
-আজকে আমি নিজ হাতে কেক বানিয়ে তোমাকে খাওয়াব।
আমি একটু অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম,
-কেক কেন?
-বারে আজকে তোমার জন্মদিন না! শুভ জন্মদিন আশফাক।
-ধন্যবাদ গ্লোরি।
কিন্তু এতে আমার ছটফটানি আরো বেড়ে গেল।
-তুমি এইরকম করছ কেন?
-না মানে…
-খবরদার বাইরে যাওয়ার নাম নিবে না। সপ্তাহের সাতটা দিনই যদি আমি তোমাকে না পাই তাহলে আমাকে বিয়ে করেছিল কেন?
আমি হাসি। হেসে বলি,
-শুধু আজকের দিনটা মাফ করা যায় না লক্ষীটি?
আমার স্ত্রী হাতের কাছেই একটা ফুলদানি (যেটা কিনা আমার আবিষ্কার জাফনিয়াম নামে নতুন একটা ধাতব দিয়ে তৈরি এবং বাসার যাবতীয় কিছু নিয়ন্ত্রন করা যায় এটি দিয়ে) নিয়ে ধপাস করে মাটিতে ফেলে দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ওটা ভাঙ্গল না। কারন জাফনিয়াম দিয়ে তৈরি জিনিস কখনো ভাঙ্গে না। রাগে দুঃখে আমার স্ত্রী মাটিতে পড়ে থাকা ফুলদানিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি আমার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বসলাম। তার হাত ধরে বললাম,
-রাগ করেছো?
-না। আমি কারো উপর রাগ করি না। আমি তো এতিম। আমার কেউ নাই।
-এভাবে বলছ কেন?
-কিভাবে বলছি?
কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থেকে গ্লোরি আমার বুকে মাথা রাখে। বলে,
-তুমি কি জান আমি সবসময় কত একাবোধ করি?
-হুমম। আমি জানি। তবে তুমি হার্মার (আমার আরেকটি আবিষ্কার যেটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম আবেগ সম্পন্ন রোবট) সাথে সময় কাটাতে পার। আমার মনে হয় সে গল্প করার জন্যে চমৎকার একজন সঙ্গী।
আমার স্ত্রী সামান্য ঠোঁট বেঁকে বলল,
-ধুর। হার্মার সাথে কথা বলতে গেলেই আমার কেমন যেন লাগে। রোবটের সাথে কি গল্প করা যায়?
-তুমি আগে থেকেই জান যে সে রোবট, তাই তুমি একথা বলছ। নাহলে পৃথিবীর কোন মানুষের সাধ্যি নেই যে বুঝতে পারে এটা রোবট না মানুষ।
কিছুক্ষন চুপ থেকে গ্লোরি বলে,
-সত্যি তোমার আজকে যাওয়া লাগবে?
তার সকরুণ কণ্ঠ আর মুখ দেখে আমার না বলতে ইচ্ছে করল কিন্তু তবু আমি বললাম,
-হ্যাঁ।
-বাসার ল্যাবরেটরিতে কাজ করলে হবে না?
-না। আমাকে অফিসের ল্যাবেই যেতে হবে। ওখানে ফর্মূলার অর্ধেকটা আছে আর অর্ধেকটা আমার মাথায়।
গ্লোরি এবার আরো কিছুক্ষন চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
-এক শর্তে তোমাকে যেতে দিতে পারি?
আমি হাসলাম। গ্লোরিকে আমার বাহু বন্ধনে চাপ দিয়ে বললাম,
-কি শর্ত?
-আমার সাথে আশার কানন স্কুলে যেতে হবে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। তবু জিজ্ঞেস করলাম,
-ওখানে গিয়ে আমি কি করব?
-তোমাকে দেখলে ওরা খুশি হবে। ওদের কাছে তুমি একজন ফ্লিমস্টারের মতই পপুলার।

আশার কানন হচ্ছে এতিম এবং পথশিশুদের জন্যে স্কুল। স্কুলটা আমার বাসার কাছেই। এর সম্পূর্ণ ব্যায়ভার আমার স্ত্রী চালান। আমার স্ত্রীও এতিম। হয়ত সেজন্যেই তিনি এই স্কুলটা চালু করেছেন। গ্লোরিকে আমি প্রথম দেখি এরকমই একটা স্কুলে। প্রধান অতিথি হয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। গ্লোরির গান গাওয়া দেখে আমি মুগ্ধ হই এবং বিয়ের প্রস্তাব দেই। ভেবেছিলাম সারাজীবন একাই কাটিয়ে দিব কিন্তু গ্লোরিকে দেখার পর মনে হয়েছিল, অনেক হয়েছে, এবার আমার একটা সঙ্গিনী চাই।
অনেকটা সময় পার করলাম আশার কানন স্কুলে। ছেলেমেয়েদের গোল করে বসিয়ে তাদের সাথে গল্প করলাম। গ্লোরি এতে খুব খুশি হল এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে যেতে দিতে সম্মত হল। কিন্তু কে জানত জীবিত অবস্থায় গ্লোরির সাথে এটাই আমার শেষ দেখা।

আমি আমার উড়ন্ত গাড়িটি (যেটি কিনা ভূপৃষ্ঠ থেকে চার/পাঁচ ফুট উপর দিয়ে যায়) নিয়ে নির্দিষ্ট দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরেই কিছু একটা সমস্যা হয়েছে অনুভব করলাম। তবু পাত্তা দিলাম না। এক রাস্তার বাঁকে ব্রেকের সুইচে চাপ দিতেই বুঝতে পারলাম আমার গাড়ির ব্রেক কাজ করছে না। সাথে সাথে আমি গাড়ির কম্পিউটারকে ড্রাইভিংয়ের আদেশ দিলাম। সে গাড়ির স্পিড আস্তে আস্তে কমাতে লাগল। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কিন্তু তা ক্ষনিকের জন্যে। তারপর আবার হু হু করে গাড়ির স্পিড বাড়তে লাগল। এবার আমি সত্যি ভয় পেলাম তবু ঘাবড়ালাম না। আমার গাড়ি বর্তমান বিজ্ঞানে এক বিস্ময়। সব ধরনের সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। কিন্তু আমার বিশ্বাস ভেঙ্গে গেল একটু পড়েই। পাশেই একটা ইলেকট্রিক পোলের সাথে (অন্যকিছু হতে পারে, ঠিক খেয়াল নেই আমার) ধাক্কা খেয়ে আমার গাড়িটি শূন্যে বনবন করে ঘুরতে থাকে। ততক্ষনে কম্পিউটার স্ক্রিনে লাল অক্ষরে লেখা উঠেছে দেখলাম, “নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ভেঙ্গে পড়েছে”। আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকলাম। তারপরেই আবার লাল অক্ষরে লেখা উঠেছে, “ভাসমান কক্ষ ভেঙ্গে পড়েছে”। আমি আমার কোমরের বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে ঝাপ দিতে চাইলাম কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারনে আমি সেটা পারলাম না। আমাকে নিয়ে গাড়িটি মাটিতে আছড়ে পড়ল। তারপর ডিকবাজি খেতে থাকল এবং পাশেই একটি ছোট জলাশয়ে গিয়ে পড়ল। জলাশয়ের পানিতে গাড়িটি যখন ডুবে যাচ্ছিল তখন আবার কম্পিউটার স্ক্রিনে লাল অক্ষরে আবার লেখা দেখলাম, “আপনাকে ছুড়ে ফেলা হল”। আমি বুঝতে পারলাম এটি একটি কম্পিউটার ভাইরাস। তার কিছুক্ষন পরেই আমি চেতনা হারাই। মনে হয় ঠিক তখনই আমার মৃত্যু ঘটেছিল।

এরপরের ঘটনা আমি জানতে পারি ওয়ার্ল্ড ডাটা নেটওয়ার্ক (এটি বিশ্বব্যাপী বার্তা সংস্থা, এখানে সব ধরনের তথ্য পাওয়া যায়) থেকে। সাতদিন পরে নিরাপত্তা কর্মীরা আমার লাশ উদ্ধার করেছিল। ততদিনে আমার সারা শরীরে পচন ধরেছে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হচ্ছে আমার মস্তিষ্কে তখনো পচন ধরেনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাকে খুব সহজে সনাক্ত করে নিরাপত্তা কর্মীরা।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আমার মৃত্যুতে দুই দিনের শোক দিবস পালন করার আহবান জানান। মন্ত্রিপরিষদের মিটিং এ সর্বসম্মতিক্রমে সবাই রাজি হোন যে আমার আবিষ্কারটি আমার উপরেই প্রয়োগ করা হবে। অর্থাৎ আমার মস্তিষ্ক সচল রাখা হবে। কারন তারা চিন্তা করলেন আমার মস্তিষ্ক দেশের অনেক সুফল বয়ে আনবে। এবং আমার সহকারীকে এর দায়িত্ব অর্পণ করলেন।

এক মাস পর…
ধীরে ধীরে আমি চোখ খুলে তাকালাম। একবার চোখ খুলেই আবার বন্ধ করে নিলাম। এত তীব্র আলো কেন? আবার আস্তে আস্তে আমার চোখজোড়া খুললাম। মাথার উপর সবুজ একটা বাতি জ্বলছে যার আলো ঠিক আমার কপালের মাঝ বরাবর পড়েছে (এটি জাইকা রশ্মি যার মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে কম্পিউটারে ডাটা ট্রান্সফার করা হয়)। আমি কোথায় আছি কিছুই বুঝতে পারি না। আমি বসে আছি না দাড়িয়ে আছি না শুয়ে আছি তাই বুঝতে পারলাম না। হঠাৎ আমার নাকে দুইটা নল আবিষ্কার করলাম। কিরকম লাল একটা তরল পদার্থ আমার নাকের মধ্যে ঢুকছে সেই নল দিয়ে (এই তরল পদার্থের নাম কলাক্সিক- মূলত এর তরলটার সাহায্যেই মানুষের মস্তিষ্ক সচল রাখা হয়)। ঠিক এ সময় ঘরের মধ্যে একটা উত্তেজনা দেখা দেয়। লোকটিকে খুব চেনা মনে হল কিন্তু এখন তাকে চিনতে পারলাম না। সে আরো তিনজন মানুষকে উত্তেজিতভাবে কিছু বলছে। তারপর সবাই মিলে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে ঝুকে পড়তে দেখলাম। আমি প্রাণপণে নিজের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। মানুষগুলোর একজনকে দেখলাম কার সাথে যোগাযোগ করে কথা বলছে। আমার ব্যাপারেই হয়ত, ভাবি আমি। ঠিক এসময় হঠাৎই আমার স্মৃতি ফিরে আসতে থাকে। এক্সিডেন্টের কথা মনে পড়ে যায়। আমি কি তাহলে বেঁচে আছি? নিশ্চয় বেঁচে আছি। পরক্ষণেই আমার ভুল ভাঙ্গে। আমার দেহ বলতে আর কিছু নেই। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি। তাহলে আমি কি মারা গিয়েছি? এরপর আমারই ফর্মুলাই আমার মস্তিষ্ক সচল করা হয়েছে? আমি আর কিছু ভাবতে পারি না। ঠিক এসময় আমার সহকারী নুরুল হুদা আমার দিকে এগিয়ে আসে।
-ওয়েলকাম ব্যাক স্যার। আপনার মস্তিষ্ক সচল করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। কেমন লাগছে স্যার?
নুরুল হুদার চেহারা দেখে হঠাৎই বলে ফেলি আমি
-আমার মৃত্যুর জন্যে তাহলে তুমিই দায়ী?
নুরুল হুদা অবাক হয়। কিন্তু সাথে সাথে সামলিয়ে নেয়। মুখে ক্রুর হাসি ফুটে উঠে।
-ঠিকই ধরেছেন স্যার। আমিই দায়ী। কি করব বলেন স্যার? আর কতদিন আপনার ছায়া হয়ে থাকব। আমারও তো নাম জশ খ্যাতি ইত্যাদি পেতে হবে। তাই না?
-তাই বলে আমাকে মেরে ফেললে? আমি তো তোমাকে সেরকম চোখে কখনো দেখতাম না। এমনকি নোবেল পুরুষ্কার নিতে গিয়েও তোমাকে সাথে নিয়ে গিয়েছি। আর তুমি কিনা…
-ফালতু কথা রাখেন স্যার। ওইসব লোক দেখানো কাজে আমার মনে ভরে না। লোকজন তো আপনার কথাই বলে। আমার কথা কি কেউ বলে? কেউ আমাকে চিনে? চিনে না।
-আমি তোমাকে ধরিয়ে দিব নুরুল হুদা।
নুরুল হুদা হা হা করে হেসে উঠে। বলে,
-পারবেন না স্যার। সে ক্ষমতা আপনার নেই স্যার। কারন কিছুক্ষন পর আপনার এই স্মৃতিটুকু ধ্বংস করা হবে।
আমার মন বিষাদে ছেয়ে যেতে থাকে।
-আমি তোমাকে অভিষাপ দেই নুরুল হুদা।
-হুমমম। আমিও আপনাকে কিছু অভিশাপ দিব স্যার। সরকার আপনার মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করতে চাই। তাদের ধারনা আপনি এখনো দেশের উপকার করতে পারবেন। কিন্তু আমি কি করে তা হতে দেই বলুন।
-কি করবে তুমি?
-কালা দবিরের কথা শুনেছেন স্যার? মানুষ খুন করা যার কাছে ছিল ডাল ভাত। প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে কাল মারা গেছে বেচারা। ভাবছি তারই কিছু স্মৃতি আপনার মস্তিষ্ক দিয়ে দিব। কেউ বুঝতে পারবে না।
নুরুল হুদা হা হা করে হাসতে থাকে। আর আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আবার যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম এক পরিচিত মুখ আমাকে ঘিরে আছে। একটু চেষ্টা করতেই বুঝতে পারলাম আমার স্ত্রী গ্লোরি।
-ভাল আছ গ্লোরি।
গ্লোরি কোন কথা বলল না। অশ্রু নয়নে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। কিছুক্ষন পর ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,
-যদি আমি তোমাকে যেতে না দিতাম…। সব আমার দোষ। আমার কপালে সুখ নেই।
আমি সান্তনা দিতে গিয়েও দিলাম না। বললাম,
-এখানে কিভাবে এলে?
-প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছিলাম। যদি তোমার জ্ঞান ফিরে তবে আমাকে একটি বারের জন্যে যেন দেখা করতে দেয়।
-ভাল করেছ। তোমার সাহায্যই আমার এখন দরকার। হার্মারকে এখানে আনতে হবে। তার আগে ওকে নতুনভাবে প্রোগ্রাম করতে হবে।
-কিভাবে?
এরপর আমি তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিলাম। গ্লোরি চুপচাপ শুনল। ওকে বলে দিতে হল না আমি কি করতে যাচ্ছি।
-কিন্তু হার্মারকে যদি না ঢুকতে দেয়?
-প্রোগ্রামটা ঠিক মত কর। তাহলেই সব হবে। এবার কথা না বাড়িয়ে প্রোগ্রামটি লিখে নাও।

এরপর গ্লোরি চলে গেল। কষ্টে আমার বুকটা ফেটে গেলেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষন পর নুরুল হুদা আসল।
-কি খবর স্যার? জীবনটা কেমন?
আমি কিছু বললাম না।
-আপনি মৃত হয়েও যে কষ্ট পাচ্ছেন, আমি জীবিত হয়েও সেই কষ্ট পেতাম স্যার। শুধু আপনার জন্যে আমার কোন পরিচিতি নেই।
-নুরুল হুদা তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ।
নুরুল হুদা হেসে উঠে। বলে,
-চলুন স্যার। কালা দবিরের স্মৃতি আপনার মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেই। তারপর আপনার স্মৃতি চিরতরে বাতাসে উড়িয়ে দিব।
নুরুল হুদা হা হা করে হাসতে থাকে। তারপর কম্পিউটারের বোতামে হাত চালাতে থাকে। আমার মস্তিষ্কে তীব্র ব্যাথা হতে থাকে।ঠিক এসময় সিকিউরিটি ভাঙ্গার শব্দ শোনা যেতে থাকে। হার্মার যখন ঘরে ঢুকে নুরুল হুদা মনে হয় বুঝতে পারে আমি কি করতে যাচ্ছি। কিন্তু হার্মার তাকে করার কিছু সুযোগ না দিয়েই বাড়ি মারে তার মাথায়। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নুরুল হুদা। এরপর কলাক্সিক তরলের ট্যাংকসহ আমার মস্তিষ্ক নিয়ে দ্রুত সরে পড়ে ওখান থেকে এবং আমার গোপন ল্যাবটরিতে নিয়ে আসে। এরপর বাকি কাজটুকু করে আমার স্ত্রী গ্লোরি। হার্মারের কপোট্রনের জায়গায় আমার মস্তিষ্কটি জুড়ে দেয় সে। কলাক্সিকের জন্যে ছোট্ট একটা ট্যাংক বসায় হার্মারের বুকে। সফল অস্ত্রপাচার শেষে আমার যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমার কোন বোধশক্তি নেই। কালা দবিরের স্মৃতি আমার মস্তিষ্কে দিতে গিয়ে কোন স্মৃতি আর অবিশিষ্ট ছিল না।

মানুষের শৈশব আর ফিরে আসে না। কিন্তু স্মৃতি হারিয়ে ফেলার কারনে আমি শিশুর জীবন ফিরে পেলাম। গ্লোরি আমাকে মায়ের মত একটু একটু বড় করতে থাকে। আমার মস্তিষ্ক হারিয়ে যাওয়ায় দেশে তোলপাড় শুরু হলেও কিছুদিন পর তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে আমি আবার আগের মত হতে থাকি। আবিষ্কার করি আমি আর সব স্বাভাবিক মানুষের মত নই। গ্লোরির মুখে সব শুনে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
গ্লোরি আমাকে আমাদের বিয়ের ভিডিও দেখায়। আমি প্রাণপন আমার অতীত ফিরে পেতে চেষ্টা করতে থাকি। এক ভিডিওতে নুরুল হুদাকে দেখে আমি চিৎকার করে উঠি। আমার মস্তিষ্কে তীব্র ব্যাথা হতে থাকে। একসময় অজ্ঞান হয়ে পড়ি। যখন আমার জ্ঞান ফিরে তখন আমি আমার স্মৃতিশক্তি ফিরে পেয়েছি।
আমি গ্লোরিকে অপেক্ষা করতে বলে ল্যাবরেটরির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গিয়ে শুনলাম নুরুল হুদা এক্সিডেন্টে মারা গেছে। প্রতিশোধ নিতে না পারলেও আমি আমার আগের জীবন ফিরে পেলাম।

পরিশিষ্ট

হার্মার আশফাক আহমেদের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে সবকিছু জানতে পারে। আশফাক আহমেদ তার স্ত্রীর ইন্তিকালের পর আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন অনুভব করেননি। যাওয়ার আগে তিনি হার্মারকে পুরনো স্মৃতি দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়ে যান।

comments

24 কমেন্টস

  1. কি মন্তব্য করা উচিত বুঝতে পারলাম না।

  2. আহ্‌ সায়েন্স ফিকশন। আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। ধন্যবাদ তাহমিদ ভাইকে এমন সুন্দর একটি লেখা উপহার দেবার জন্য।

  3. ভবিষ্যতের রুপকথার গল্প পরতে ভালই লাগে, মনে হয় দাদীর মুখ থেকেই শুনছি। সুন্দর হয়েছে, শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ ।

    • একটু ভুল বললেন ভাই, ভবিষ্যতের গল্প পড়লে ‘নাতির মুখ থেকে শুনছি’ মনে হওয়ার কথা !! 😀

  4. খুব বেশি ভাল কিছু হয়নি। চেষ্টা করুণ আরো ভাল কিছু লিখতে। যাহোক, ধন্যবাদ।

    • হা হা হা। ওকে। চেষ্টা করব আরো ভাল কিছু লিখতে।

  5. অনেকদিন পর চমৎকার একটি লিখা পড়লাম। খুবই সুন্দর হয়েছে। সামনে আরও এই রকম সুন্দর লিখার জন্য শুভকামনা রইল।

    • হুম। ধন্যবাদ ভাই। আপনার ভাল লেগেছে বলে ভাল লাগল। আরো ভাল লেখার চেষ্টা করব।

  6. সায়েন্স ফিকসনটি পড়িয়া বেদনাদায়ক আনন্দ অনুভব করিলাম। আমার মস্তিষ্ক থেকে কিছু কিছু অক্ষর মুছে দিতে চাই, হার্মার বেটাকে আমারও দরকার।

  7. এক ভাই বললেন, “খুব বেশি ভাল কিছু হয়নি”। কিন্তু কই? আমার তো দারুণ লাগলো। অনেক শুভ কামনা তাহমিদ ভাইকে। চালিয়ে যান ভাইয়া 🙂

  8. ফিকসনের শুরুতে আপনি বলেছেন, আপনি কেবল মস্তিস্ক বাঁচিয়ে রাখার পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন, এই পদ্ধতিতে শরীরের কোন অঙ্গ সচল থাকার কথা না। কিন্তু পরে বলা হয়েছে আপনি মারা যাবার পরও কথা বলতে পারতেন। ব্যাপার টা কি?

  9. এস এম তাহমিদুর রহমান ভাইয়া, আপনার লেখাটা পড়ে অনেক দিন পর আবার আসল মজাটা পেলাম। আপনার মত আমিও একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু আপনার মত লিখতে পারি না, তাই পড়ার চেষ্টা করি। ভালো থাকবেন।

  10. ভালই চেষ্টা করেছেন ভাই। আশা করি ভবিষ্যতে আর ভাল লেখা পাব আপনার কাছ থেকে।

  11. এত সুন্দর একটা গল্প কিভাবে লিখলেন রে ভাই? অসাধারণ একটা গল্প পড়লাম। ভবিষ্যতে এরকম আরো লেখা পাবো বলে আশা করি। আপনার জন্য রইল শুভকামনা………

  12. অসাধারণ। অনেক ধন্যবাদ এই পোস্টটির জন্য। লিখতে থাকুন, কোন কোন পোস্টে কেউ কেউ হইত কড়া মন্তব্য করবে তবুও লিখতে থাকুন আগামীতে আরো ভালভাবে নতুন কিছু উপস্থাপনের জন্য। আপনার এই প্রতিভাকে ঐসব মন্তব্য দিয়ে শান/ধার দিয়ে আর তিক্ষ্ণ করে তুলুন। ধন্যবাদ………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.