রিপা দাসঃ শুক্র গ্রহ বা ভেনাস (Venus) সৌরজগতের দ্বিতীয়গ্রহ। সূর্য থেকে দূরত্বের দিক থেকে হিসেব করলে সূর্যের একেবারে কাছের গ্রহ হচ্ছে বুধ গ্রহ, আর এর পরই শুক্র গ্রহের অবস্থান। সকালের আকাশে একে শুকতারা এবং সন্ধ্যার আকাশে একে সন্ধ্যাতারা বলে ডাকা হয়। এর কোনওউপগ্রহ নেই। এর বায়ুমণ্ডল প্রধানত কার্বনডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত। কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ শতকরা ৯৬.৫% আর নাইট্রোজেনের পরিমাণ শতকরা ৩.৫% মাত্র। এতে অতি সামান্য পরিমাণে জলীয়বাষ্প, আর্গন, কার্বন মনোক্সাইড প্রভৃতি আছে। কার্বনডাই-অক্সাইড ও জলীয়বাষ্প থাকার দরুন শুক্রের মতো পৃথিবীরও একটি গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া আছে।

সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ হিসেবে শুক্রের রয়েছে কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে চলুন আজশুক্র গ্রহ সম্পর্কে ১০টি বিচিত্র তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

Untitleddsdd

 

১)শুক্রু গ্রহের আগ্নেয়গিরি (Venusian Volcanoes)

সৌরজগতের অন্য কোন গ্রহের তুলনায় শুক্র গ্রহে আগ্নেয়গিরির পরিমাণ বেশি। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তার পৃষ্ঠে ১৬০০টির অধিক আগ্নেয়গিরির সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু সম্ভবত আরো অনেক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে শুক্রু গ্রহে যাদের সম্পর্কে আমরা আজও জানি না। সুপ্ত মনে হলেও বিজ্ঞানীদের ধারণা এই আগ্নেয়গিরিগুলো যেকোনো সময় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

২) বছরের তুলনায় দিন বড় !

শুক্র গ্রহের একটি দিন পৃথিবীর ২৪৩ দিনে স্থায়ী হয় (এক আবর্তন পূর্ণ করতে শুক্র গ্রহের লাগে ২৪৩ আর্থ ডে)। যেখানে শুক্রের এক বছর (২২৪.৭০১ দিন) সমান পৃথিবীর (৩৬৫.২৫৬ দিন)(সূর্যকে প্রদক্ষিণের সময় অনুসারে)।

৩) শুক্র, পৃথিবীর টুইন?

সৌর জগতের সকল গ্রহের মধ্যে শুক্র আর পৃথিবীর মাঝে রয়েছে অনেক মিল যার কারণে শুক্র গ্রহকে পৃথিবীর যমজ বলা হয়।

দুটি গ্রহই প্রায় সমান আকারের। তাছাড়া পৃথিবী এবং শুক্রের মধ্যে গাঠনিক উপাদান এবং আচার-আচরণে বড় রকমের মিল রয়েছে। এর দৈহিক গঠন পৃথিবীর মত শক্ত। এর ভর পৃথিবীর ০.৮২ গুণ আর ব্যাস পৃথিবীর ০.৯৫ গুণ। এর গড় ঘনত্ব ৫.১ যাপৃথিবীর ঘনত্বের চেয়ে সামান্য কম।

Untitlediji

সৌর জগতের যেকোনো গ্রহের তুলনায় শুক্রও পৃথিবীর কক্ষপথ সবচেয়ে নিকটস্থ অবস্থানে রয়েছে। উভয় গ্রহের রয়েছে অপেক্ষাকৃত নবীন পৃষ্ঠতল এবং সেই সঙ্গে উভয় গ্রহের রয়েছে মেঘে পূর্ণ ঘন বায়ুমণ্ডল। (যদিও শুক্রের মেঘ বেশিরভাগ বিষাক্ত সালফিউরিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ)।

 

৪) অতিমাত্রায় গরমশুক্র গ্রহ

তার বায়ুমণ্ডল অধিক পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড পূর্ণ হওয়ায় চরম গ্রিনহাউজ এফেক্ট শুক্র গ্রহের পৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে চলেছে। তাপমাত্রা ৮৭০ ডিগ্রী ফারেনহাইট (৪৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস) অবধি পৌছতে পারে।

বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজের অধিক মাত্রার কারণেএই গ্রহের উপরিতল সীসাকে দ্রবীভূত করার মত যথেষ্ট গরম। নাসা’র জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির একজন বিজ্ঞানী তার একটি বিবৃতিতে এ খবর জানান।

৫) প্রেসার কুকারের অনুরূপ শুক্র গ্রহের বায়ু

শুক্র গ্রহের পৃষ্ঠের উপর বায়ুর চাপ খুব বেশি। পৃথিবীর সমুদ্র স্তরের চাপের তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ বেশি। অন্য কথায়, শুক্র গ্রহের চাপ পৃথিবীর সমুদ্রের জলের চাপের অনুরূপ, প্রায় এক মাইলের অর্ধেক(১ কিমি)।

Untitledhbjuhi

৬) শুক্র সূর্যকে অতিক্রমকারী একটি গ্রহ

সূর্যের উপর দিয়ে কোন গ্রহের অতিক্রম করার বিষয়টি একটি দুর্লভ মহাজাগতিক ঘটনা। শুক্র অন্য গ্রহের তুলনায় বিরল একটি গ্রহ, কারণ শুক্র সূর্যের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রমকারী একটি গ্রহ! শুক্র গ্রহের এই ধরনের পরিক্রমনকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ট্রানজিট অব ভেনাস’। শুধু শুক্র ও বুধ পৃথিবীর অনুকূল অবস্থান থেকে এই কাজটি করে থাকে। শুক্রকে এমন করে গমন করতে খুব কমই দেখা যায়।

বুধ ওশুক্র গ্রহের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের উপর হেলানো রয়েছে বলেই পৃথিবীথেকে আমাদের সৌরজগতের এই দুটি গ্রহের ট্রানজিট দেখা সম্ভব। এই অসাধারণ দৃশ্য ২০১২ সালের ৫,৬ জুন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, পশ্চিম এশিয়া,ইউরোপ,আফ্রিকার পূর্বাঞ্চল থেকে দেখা গেছে। দূরবীন আবিষ্কারের পর সপ্তমবার শুক্রের এই অতিক্রমণের সাক্ষী হতে পেরেছে মানুষ।

 

৭) উজ্জ্বল গ্রহ

যদিও শুক্র সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ নয় কিন্তু, এটি পৃথিবীর নিকটে অবস্থান করায় আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ হিসেবে বিরাজ করে। পৃথিবীর সাপেক্ষে এর অবস্থানের দরুন একে আমাদের আকাশে সবসময় সূর্যের কাছাকাছি দেখা যায়; সূর্য থেকে এর সর্বোচ্চ কৌণিক দূরত্বহতে পারে ৪৮ ডিগ্রি।

এটি সূর্য থেকে ১০.৮২ কোটি কিলোমিটার আর পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রাতের বেলা চাঁদের পর এটি আকাশের দ্বিতীয় উজ্জ্বলবস্তু হিসাবে যোগ্যতা অর্জন করেছে।

Untitledhiu

৮) একটি প্রাচীন রহস্য

শুক্র গ্রহকে হাজার বছর ধরে পর্যবেক্ষণের একটি টার্গেটেরাখা হয়েছে।

প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা ১৬০০ বিসি এর কোনো এক সময় শুক্র গ্রহের আকাশে উদ্দেশ্যহীন ভ্রমেণের কথা রেকর্ড করেছিলেন। গ্রিক গণিতবিদ পিথাগোরাস সকালে ও সন্ধ্যায় আকাশে উজ্জ্বল তারকাটি যে আসলে একই বস্তু শুক্র ছিল তা আবিষ্কার করেন।

আমাদের আকাশের সকল গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে ইতিহাসের সর্বত্র শুক্র সবচেয়ে চর্চিত এবং জল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

৯) শুক্রের বাতাস খুবই ভারি

অবাক করার বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর দ্রুততম টর্নেডোর তুলনায় দ্রুততর শুক্রের বাতাস! এর বাতাস অতিদ্রুত গতিতে মাঝখানের মেঘের স্তরের মধ্যে এক ঘন্টায় প্রায় ৪৫০ মাইল

১০) শুক্র গ্রহের পর্যায় (ফেজ)  আছে

শুক্র যখন সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে তখন এর পুরো পর্যায় থাকে। আবার পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে এটি নতুন ফেজ বা পর্যায়ের প্রদর্শিত করে।

১৬১০ সালে এই পর্যায়ক্রমের প্রথম সাক্ষী ছিলেন ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও।

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.