ত্বক আমাদের দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ত্বক আমাদের দেহের বহিরাবরণ হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের দেহকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করে। ত্বকেরও সময়ে সময়ে কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে। এসব পরিবর্তনের স্বাভাবিক কারণ হতে পারে রোগ,বয়স বা প্রাকৃতিক অবস্থা। ফলে ত্বকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত হয়, আর তখন প্রয়োজন পরে ত্বকের প্রতিস্থাপন বা চিকিৎসা। কিন্তু বেশ কিছু বছর আগেও ত্বকের প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা একটি সেকেন্ডারি বা কৃত্রিম ত্বক তৈরি করেছেন যা পলিমার দ্বারা তৈরি এবং এটি মানবত্বকের মতোই শক্ত, প্রসারণশীল এবং সংলগ্নতা সম্পন্ন ।

মাসসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি এর বায়োলজিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক রবার্ট লাঙারের মতে “এটা অনেকটা স্বচ্ছ ক্রিম এর মতো যা ত্বকে ব্যবহার করা যায়।”

“ভিটামিন-ডি এর প্রয়োজন হলে সাধারণত আমাদের রোদ পোহাতে বলা হয়। কথা সত্য হলেও রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে সূর্যের আলো পোহানোর ফলে কি আমাদের শরীরে ভিটামিনের ফ্যাক্টরি তৈরি হচ্ছে?” বলেন রবার্ট লাঙার।

লাঙার আরও বলেন, “আমরা নতুন একটি প্রোডাক্ট তৈরি করেছি যা কিনা নিরাপদ এবং আমরা এটি মানুষের উপর প্রয়োগ করে দেখেছি এটি মানব ত্বকের মতই প্রসারণশীল,সংলগ্ন এবং মজবুত। তাছাড়া এটি ব্যবহার পদ্ধতিও বেশ সহজ।”

রবার্ট লাঙার “অলিভো” ল্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠা। এই ল্যাব থেকেই সেকেন্ডারি ত্বক তৈরি করা হয়েছে। রবার্ট লাঙার জানান যে, তিনি এবং তার সহকর্মীরা দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এর উপর কাজ করে আসছেন।”

সিলিকনের পর্দার উপর ভিত্তি করে দু’ধরনের ক্রিম তৈরি করা হয়েছে, যা একটির পর অন্যটির ব্যবহার করা হয় এবং এই কম্বিনেশনের ফলে এক ধরনের স্বচ্ছ-অদৃশ্য পলিমারের আবরণ পরে যা কিনা ত্বকের নিচে থাকে এবং ত্বককে শক্তিশালী করে। এই আবরণটি ত্বকের শ্বাস-প্রশ্বাসে কোন বাধা সৃষ্টি করে না।

লাঙার বলেন, “আসল ত্বকের ন্যায় স্থিতিস্থাপক, মজবুত, স্থিতিশীল এবং সচল শ্বাস-প্রশ্বাস ও সংলগ্নতা সম্পন্ন সেকেন্ডারি ত্বক তৈরি করা সত্যি একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।” “এর জন্য আমরা সংযুক্তি করতে সক্ষম এমন রসায়ন ব্যবহার করেছি এবং প্রায় শখানেকের মতো বিভিন্ন পলিমার তৈরি করেছি যার মধ্যে একটি খুবই ভালো কাজ করছে।”

পাঁচ বছর আগে এক গবেষণায় তৈরি এই সেকেন্ডারি ত্বকটি এক্সপিএল নামে পরিচিত যা প্রায় যা শখানেক বিভিন্ন ধরণের পলিমারে তৈরি।

এটির রাসায়নিক গঠনটি “সিলক্সোন” নামে পরিচিত। এটি সিলিকন ও অক্সিজেন এর পর্যায়ক্রমিক অবস্থানে তৈরি। আণবিক গঠনের বিপরীত সংযুক্তির ফলে যে দ্রব্যের মিশ্রণ তৈরি হয়েছে তা স্থিতিস্থাপকতা গুণসম্পন্ন এবং এটি ত্বকের উপর ব্যবহার উপযোগী পর্দা তৈরি করে।

এক্সপিএল ক্রিম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটির দুটি স্তর আছে। প্রথম স্তরটি মূল উপাদান বহন করে আর দ্বিতীয় স্তর একটি প্লাটিনাম ক্যাটালিস্ট যা একটি প্রাণবন্ত ত্বকের রূপ দেয়। ল্যাবে সেকেন্ডারি ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং দেখা গেছে, যেখানে আসল ত্বক ১৮০% পর্যন্ত প্রসারণক্ষম, এটি ২৫০% পর্যন্ত প্রসারণশীল।

এক্সপিএল কেমিক্যালের আণবিক গঠন একটি অক্সিজেন অণুর সংযুক্তি দুটি সিলিকন অণুর সাথে। যা কিনা পলিমার এর একটি দীর্ঘ শিকল তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এরূপ একটি দীর্ঘ পলিমার চেইন তৈরি করেছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আণবিক গঠন সৃষ্টি করে এক্সপিএল তৈরি করেছেন। এরপর এটি দুটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে প্রথম পলিমার একটি স্বচ্ছ তরল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই পলিমার যদিও শক্তিশালী নয় তথাপি এটি এর পরের ধাপের উপাদানের সাথে বন্ধন গঠন করে শক্তিশালী, মজবুত এবং কাঙ্ক্ষিত উপাদান তৈরি করে। এরপর বিজ্ঞানীরা সেকেন্ডারি ত্বককে আরও স্বচ্ছ, পরিষ্কার, স্থিতিশীল করার জন্য অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবহার করেন যাতে প্রসাধনীর বাহিরেও চিকিৎসার জন্য এটি ব্যবহার করা যায়।

সেকেন্ডারি ত্বক চোখের নিচে প্রয়োগ করে দেখা গেছে, বয়সের কারণে চোখের নিচে যে ভাজ পরে তা টানটান করে দেয় যার ফলে বয়স কমে তারুণ্য ফিরে আসে।

শুধু তাই নয়, এই ত্বক আসল ত্বকের ন্যায় পানি ও অন্যান্য কেমিক্যাল উপাদান ধরে রাখতে সক্ষম।

মাসসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের ডার্মাটালোজিষ্ট অধ্যাপক বারবারা গিলক্রেস্ট বলেন , “এর আগেও এই ধরণের দ্রব্য তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু আসল কোনবারই ত্বকের গুনাগুন সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি, যা এবার সম্ভব হয়েছে।”

বিজ্ঞানীরা আরও বলেন “নতুন এই সেকেন্ডারি ত্বক দুই ধাপে তৈরি যা পলিসিলিক্সিন পলিমার ফর্মুলায় তৈরি হয়। আসল ত্বকের নতুন আকৃতি দিতেও সক্ষম সেকেন্ডারি এই ত্বক।”

ত্বক সম্পর্কিত চিকিৎসাশাস্ত্র এবং একই সাথে রুপচর্চার জগতে এক বিস্ময় সৃষ্টি করতে যাচ্ছে এই নতুন ত্বক।

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.