চাইলে কি আমরা আমাদের আয়ু বাড়িয়ে নিতে পারি? দেহের ‘আজব ঘড়ি’টিকে চালাতে পারি আমাদের ইচ্ছেমতো?আমাদের আয়ু কি আমরা বাড়িয়ে নিতে পারি আরও ৫/৬ গুণ? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, সেটা খুব একটা অসম্ভব নয়।কারণ, হদিশ মিলেছে আয়ুষ্মান জিনের। যে জিন আমাদের আয়ু বাড়িয়ে দিতে আরও বেশ কয়েক গুণ।  বিজ্ঞানীরা এমন একটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন। যেটা নেমাটোডের মতোই ‘ডেথ অ্যাসোসিয়েটেড প্রোটিন’ বা ‘ডিএপি জিন’। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, এটি কোষের মধ্যে একটি ‘গ্রোথ হরমোন’- ‘আইজিএফআই’-এর পরিমাণ কোষের মধ্যে অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তার ফলে, কোষগুলো নিজেদেরকে অসুস্থ হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারে, প্রচুর পরিমাণে ‘অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট’ বানায়। আর এই ভাবে পুরনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে নতুন জীবন দেয়।যদিও এই আবিষ্কারটি এখনও পর্যন্ত শুধু ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে মানুষের ওপর এর প্রয়োগের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বেশি দিন তো আমরা সকলেই বাঁচতে চাই। সমুদ্র মন্থন করে অমৃতকুম্ভের সন্ধান যে শুধু দেবতারাই করেছেন, তা নয়। যুগ যুগ ধরে মানুষেরও কামনা সেই ‘অমৃত’টুকু পান করার।

সে ক্ষেত্রে প্রথমেই আমাদের মনে যে প্রশ্নটি আসে, তা হল- আমাদের বার্ধক্য আসে কেন? আমাদের শরীরে কী এমন ঘটে, যার ফলে আমরা বুড়ো হই?

সেই ‘অমৃতকুম্ভে’র সন্ধানে নেমে একেবারে হালে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কী ভাবে আমাদের দেহে বার্ধক্য আসে, তা বুঝতে গেলে প্রথমেই জানা দরকার- কেন, কোন কোন কারণে শরীরের এক-একটি কোষ শিকার হয় বার্ধক্যের। আর তার জন্য আমাদের কোষগুলোর কী ভূমিকা রয়েছে?  আমাদের লাইফস্টাইল কতটা দায়ী?

 লক্ষ-কোটি কোষ দিয়ে আমাদের শরীর গড়ে ওঠে। যত দিন সেই কোষগুলো এক সঙ্গে কাজ করে, আমরা হেসেখেলে বেঁচে থাকি। আর যখন তাদের এক সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটে, তখনই আমরা শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। শরীরে জড়তা আসে। একটু একটু করে পৌঁছে যাই বার্ধ্যকের দোরগোড়ায়।তাই বার্ধক্য পৃথিবীর সব প্রাণীরই অনিবার্য ভবিষ্যৎ।

প্রাণীজগতে যেমন রয়েছে অতি স্বল্পায়ু প্রাণী। তেমনই রয়েছে অতি দীর্ঘায়ু প্রাণীও। যেমন, কিছু কিছু প্রাণী আছে, যারা এক বার প্রজননের পরেই মারা যায়।আবার গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কিছু কচ্ছপের বয়স ১৭০ বছর। সামুদ্রিক লবস্টারের বয়স ১৪০ বছর। আর বিশেষ কয়েকটি সামুদ্রিক ঝিনুকের বয়স ৪০০ বছরের ওপর।

ভাবুন, সেই চন্দ্রগুপ্তের আমল থেকে তারা দিব্যি বেঁচে রয়েছে!

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন প্রত্যেকটি প্রাণীর ক্ষেত্রে তাদের শরীরের কোষগুলো কত দিন বাঁচবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে কোষের মধ্যে থাকা একটা আশ্চর্য ‘জৈবিক ঘড়ি’ বা ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’-এর ওপর। এই ঘড়িটির মেয়াদ শুধুই কিছুটা সময়ের জন্য। আর ওই ঘড়ির চলা শেষ হলেই কোষগুলোর মৃত্যু হয়।

দেখা গিয়েছে, বেঁচে থাকার সময় শরীরের কোষগুলো ক্রমাগত নিজেদের ভাঙে। যাকে বলে ‘বিভাজন’। এই ভাবে নিজেদের ‘DNA কপি’ বা প্রতিচ্ছবি বানিয়ে তারা নতুন নতুন কোষ তৈরি করে। ১৯৩০ সালে লেওনার্ড হেফ্লিক মানুষের কোষগুলোর ওপর গবেষণা চালাতে গিয়ে দেখলেন, মানুষের কোষগুলো অন্তত ৫০ বার নিজেদের ভাঙতে বা ‘বিভাজন’ করতে পারে।যাকে ‘হেফ্লিক লিমিট’ বলা হয়। আর এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করতে তাদের ঠিক ৯ মাস সময় লাগে। এই কোষ বিভাজন প্রক্রিয়াটি এক-একটি পশুর ক্ষেত্রে এক-এক রকম।যেমন, গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ‘হেফ্লিক লিমিট’টি ১২৫ বার হয়। আর কোনও মানুষ ৮৫ বছর বেঁচে থাকলে, তার ‘হেফ্লিক লিমিট’টি হয় সাকুল্যে ২০ বার।এই ভাবেই ‘হেফ্লিক লিমিট’-এর সঙ্গে সেই প্রাণীর সম্ভাব্য আয়ুর একটা যোগসূত্র থাকে।

 

গত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা কোষগুলোর ভেতরকার সেই জিন-কে চেনার কাজে লেগে আছেন। যাতে কি না মানুষের আয়ু উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যেতে পারে। ১৯৯৩ সালে বিজ্ঞানী  সিন্থিয়া কেনিয়ন একটি কেঁচো জাতীয় প্রাণীর (নেমাটোড) মধ্যে ‘ডিএএফ-টু’ আর ‘ডিএপি-সিক্সটিন’ বলে দু’টি জিন আবিষ্কার করলেন। যে দু’টি জিন ওই প্রাণীটির কোষের ‘আজব ঘড়ি’টির সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে, প্রাণীটির আয়ু (যা কি না শুধুই ১৪ দিনের) বাড়িয়ে দ্বিগুণ (২৮ দিন) করে দিতে পেরেছিলেন।

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.