আমরা স্মার্টফোন ব্যাবহারের আগে থেকে ব্লুটুথ ব্যবহার করে আসছি। আপনার ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, স্পীকার ইত্যাদি সকল ডিভাইজে রয়েছে ব্লুটুথ এর উল্লেখ্যযোগ্য ব্যবহার। এই প্রযুক্তিটি অনেক জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি রয়েছে এ নিয়ে আমাদের মনে কিছু ভুল ধারণা। আজ আমি ৫টি ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করবো এবং এই ধারণা গুলোর অবসান ঘটানোর চেষ্টা করবো। তো চলুন শুরু করা যাক।

১। ব্লুটুথ চালু করে রাখলে ব্যাটারি অপচয় হয়

এটি একটি প্রধান ভুল ধারণা। আপনি হয়তো যখনই দেখেন যে আপনার ফোনে ব্লুটুথ অন হয়ে আছে তখনই ভাবতে শুরু করেন এইরে ফোনের চার্জতো সব শেষ হয়ে গেলো। কিন্তু আসলে এটি মোটেও সত্য নয়। তবে হ্যাঁ, আগের স্মার্টফোন গুলোতে এই ব্যাপারটি ঘটতো। কারন আগের ফোন গুলোতে ব্লুটুথ অন হয়ে থাকলে এটি সবসময় আশেপাশের ডিভাইজ গুলো সার্চ করতে থাকতো পেয়ার করার জন্য। আর এর ফলে কিছু ব্যাটারি লাইফ অপচয় হতো।

আপনার ফোনে যদি নতুন প্রযুক্তি ৪.০ বা তার উপরের স্ট্যান্ডার্ড থাকে তবে কখনোই আপনার ফোনের ব্যাটারি অপচয় হবে না। ৪.০ বা এর উপরের স্ট্যান্ডার্ডে লো এনার্জি (এলই) নামক একটি মডিউল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। লো এনার্জি মডিউল আগের প্রযুক্তির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন সিস্টেমে নতুন ডিভাইজ পেয়ার এবং সার্চ করে থাকে। আপনার ফোনের ব্যাটারি ঠিক তখনই খরচ হয় যখন আপনি কোন ফাইল আদান প্রদান করবেন বা কোন কাজ করাবেন আপনার ডিভাইজ দিয়ে। কিন্তু শুধু কোন ডিভাজের সাথে কানেক্ট হয়ে থাকলেই ব্যাটারি অপচয় ঘটবে না। মনে করুন আপনি আপনার ফোনের সাথে একটি ওয়্যারলেস হেডসেট কানেক্ট করে রাখলেন কিন্তু যতক্ষণ না আপনি কোন মিউজিক প্লে করছেন ততোক্ষণ আপনার ফোনের ব্যাটারির অপচয় ঘটবে না।

তাছাড়া বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড পুরাতন স্ট্যান্ডার্ড থেকে অনেক কম পাওয়ার প্রয়োজন পরে। যেখানে পুরাতন স্ট্যান্ডার্ড খরচ করে ১ ওয়াট সেখানে বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড খরচ করে এর প্রায় হাফ এনার্জি অর্থাৎ ০.০১ ওয়াট এবং কখনো কখনো ০.৫ ওয়াট। তাই শুধু ব্যাটারি অপচয় নয় এটি মূলত ব্যবহার হতেও অনেক কোন ব্যাটারি লাইফ ব্যবহার করে থাকে।

২। ব্লুটুথ ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

এই প্রযুক্তিটি ওয়্যারলেস তরঙ্গের উপর কাজ করে থাকে। আর যেখানেই আসে তরঙ্গ বা ফ্রিকুএন্সির বিষয় আমরা সেখানেই রেডিয়েশন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে আরম্ভ করে দেই। আসলে স্মার্টফোন, ওয়াইফাই, ব্লু-টুথ এতোটা শক্তিশালি তরঙ্গ ব্যবহার করে না যা আপনার শরীরের ক্ষতি সাধন করতে পারে।

ব্লু-টুথ ক্লাস ১ ডিভাইজ গুলো সর্বউচ্চ ১০০ মিলিওয়াট এনার্জি খরচ করে যা সত্যিই অনেক কম। তাছাড়া আপনি যেসব ডিভাইজ ব্যবহার করেন তা সাধারনত ১ মিলিওয়াট এনার্জিতেও চলতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে আপনার ফোনের ৩জি বা ৪জি নেটওয়ার্ক ১,০০০ মিলিওয়াট থেকে ২,০০০ মিলিওয়াট পর্যন্ত এনার্জি ক্ষয় করতে পারে এবং তরঙ্গও বেশি ব্যবহার করে থাকে। তবে আপনার ফোনের চাইতে আপনার ব্লু-টুথ হেডসেট অনেক কম পাওয়ার ক্ষয় করে থাকে এবং রেডিয়েশন ছড়ায়। আপনার সত্যিই যদি রেডিয়েশন নিয়ে কোন প্রকারের ভয় থাকে তবে ব্লু-টুথ হেডসেট ব্যবহার করা উত্তম হবে।

৩। ব্লুটুথ অনেক কম রেঞ্জে কাজ করে

অনেকে মনে করে থাকেন যে ব্লু-টুথ সিগন্যাল রেঞ্জ অনেক কম হয়ে থাকে। হয়তোবা আপনিও খুব বেশি সিগন্যাল রেঞ্জ পান না। কিন্তু আপনি আপনার ফোনে রেঞ্জ পাচ্ছেন না এই বলে কিন্তু এই প্রযুক্তিরই রেঞ্জ কম এটা ভাবা ঠিক হবে না। আসলে এর সিগন্যাল রেঞ্জ কাজ করে থাকে বিভিন্ন ক্লাসের উপরে। বন্ধুরা আপনি জানেন কি ব্লু-টুথ প্রযুক্তিতে বিভিন্ন ক্লাস রয়েছে? এবং বিভিন্ন ক্লাসের রেঞ্জ হয়ে থাকে ভিন্ন।

  • ব্লু-টুথ ক্লাস ৩ ডিভাইজে সিগন্যাল রেঞ্জ থাকে ১০ মিটারস এর কম
  • ব্লু-টুথ ক্লাস ২ ডিভাইজে সিগন্যাল রেঞ্জ থাকে ১০ মিটারস এর আশেপাশে
  • ব্লু-টুথ ক্লাস ১ ডিভাইজে সিগন্যাল রেঞ্জ থাকে ১০০ মিটারস পর্যন্ত

সাধারনত ব্লু-টুথ ক্লাস ১ থাকে সেসকল ডিভাইজে যেখানে ব্লু-টুথ এর জন্য থাকে আলাদা পাওয়ার সাপ্লাই এবং আলাদা ডিভাইজ অপশন। যেমন ল্যাপটপ এবং ডেক্সটপে ব্লু-টুথ ক্লাস ১ ব্যবহার করতে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বেশিরভাগ স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং হেডসেট গুলোতে ক্লাস ৩ এবং ক্লাস ২ ব্যবহার করতে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু উপরের বর্ণিত রেঞ্জগুলো শুধু বাধা ছাড়া কাজ করতে পারে। যদি কোন ওয়ালের বাধা থাকে তবে তাত্ত্বিকভাবে দেওয়া রেঞ্জে কাজ নাও করতে পারে। তবে বর্তমানে আপনি যদি ওয়াইফাই ডিরেক্ট ব্যবহার করে ফাইল আদান প্রদান করেন তবে আমি বলবো এটা ব্লু-টুথ থেকে উন্নত পারফর্মেন্স দিতে সক্ষম হবে। ওয়াইফাই ডিরেক্ট হলো একটি প্রযুক্তি যা কোন প্রকারের হটস্পটে না থেকে সাধারন কমুনিকেশন যেমন প্রিন্ট করা, ফাইল শেয়ার, সিঙ্ক, ডিসপ্লে শেয়ার ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

৪। নন-ডিসকভারেবল ডিভাইজ করে রাখলে নিরাপদে থাকা যায়

অনেকে মনে করে থাকেন যে ব্লু-টুথ নন-ডিসকভারেবল করে রাখলে কেউ তাদের ডিভাইজ খুঁজে বের করতে পারবে না এবং কানেক্ট করতে পারবে না। কিন্তু আসলে এটি একদমই সত্য নয়। ব্লু-টুথ প্রযুক্তি নিরাপত্তার দিক থেকে কখনো এতোটা উন্নত ছিল না। যদিও বর্তমান স্ট্যান্ডার্ডে আগের অনেক নিরাপত্তা সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও আপনার ফোনে  ব্লু-টুথ যদি অন করে রাখেন তবে যতই নন-ডিসকভারেবল করে রাখুন না কেন আপনার ডিভাইজ এখনো খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

ব্লুটুথ ডিভাইজ অ্যাড্রেস (বিডিএ) যদিও নন-ডিসকভারেবল মুডে লুকায়িত অবস্থায় থাকে তারপরেও একজন হ্যাকার যদি চান হবে বিশেষ প্রোগ্রাম ব্যবহার করে স্ক্যান করে আপনার ব্লুটুথ ডিভাইজ অ্যাড্রেস সহজেই পেয়ে যেতে পারে। আর সবচাইতে বড় সমস্যা হলো বেশিরভাগ ডিভাইজ ডিফল্ট পাসওয়ার্ড হিসেবে একই পাসওয়ার্ড যেমন “০০০০” বা “১২৩৪” ব্যবহার করে থাকে। তাই একজন হ্যাকারের কাছে যদি আপনার ফোনের ব্লুটুথ ডিভাইজ অ্যাড্রেস থাকে তবে সে ডিফল্ট পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সহজেই আপনার ফোনের সাথে কানেক্ট হতে পারে।

তাছাড়া হ্যাকাররা ব্লুজাকিং এর মাধ্যমে আপনার কাছে পাসওয়ার্ড পেতে পারে। ব্লুজাকিং হলো একটি পদ্ধতি যা ওবিইএক্স প্রোটোকলে কাজ করে এবং একটি ব্লু-টুথ অ্যানাবল ডিভাইজ থেকে আরেকটি ব্লু-টুথ অ্যানাবল ডিভাইজে টেক্সট ম্যাসেজ, কন্টাক্ট নাম্বার সেন্ড করতে পারে। ম্যাসেজে স্পাম করার মাধ্যমে হ্যাকার আপনার কাছে থেকে পাসওয়ার্ড পেয়ে যাবে সহজে।

তাই আপনি যদি এসকল ম্যালিসিয়াস অ্যাক্টিভিটি এবং পাসওয়ার্ড চুরি যাওয়া থেকে বাঁচতে চান তবে নন-ডিসকভারেবল না করে রেখে সরাসরি ব্লুটুথ বন্ধ রাখাই ভালো হবে। তাছাড়া আপনি ফোনের ব্লু-টুথ সেটিংস থেকে ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে নিতে পারেন।

৫। ব্লু-টুথ ওয়াইফাই সিগন্যালের সাথে সংঘর্ষ বাঁধায়

অন্যান্য ওয়্যারলেস প্রযুক্তির মতো ব্লুটুথ প্রযুক্তিও রেডিও তরঙ্গ ২.৪ গিগাহার্জের উপর কাজ করে ডাটা আদান প্রদান করে এবং এই একই রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে আপনার ওয়াইফাই থেকে শুরু করে ঘরের মাইক্রোওভেন পর্যন্ত কাজ করে। তাই স্বাভাবিক ভাবে আপনার মনে হতে পারে ব্লু-টুথ ব্যবহার করার সময় অন্য ওয়্যারলেস তরঙ্গের সাথে মিক্স হয়ে যেতে পারে এবং আপনার ডাটা প্রবাহ স্পীড কমে যেতে পারে। কিন্তু ব্লুটুথ ৪.০ বা এর উপরের স্ট্যান্ডার্ড কাজ করে অ্যাডাপ্টিং ফ্রিকুএন্সি হোপিং নামক সিস্টেমের সাহায্যে।

২.৪ গিগাহার্জ ফ্রিকুএন্সি হলো একটি ব্যান্ড যা ২,৪০০ মেগাহার্জ থেকে ২,৪৮৩.৫ মেগাহার্জে উঠানামা করে কাজ করতে পারে। ব্লুটুথ ৪.০ বা এর উপরের স্ট্যান্ডার্ড দুটি চ্যানেল ব্যবহার করে এবং প্রত্যেক ব্যান্ড ৫০% ব্যবহার করে কাজ করে। যখন অন্যকোন ডিভাইজ একই ব্যান্ড এবং তরঙ্গ ব্যবহার করে তখন ব্লু-টুথ তার ডাটা প্রবাহ একটি থেকে আরেকটি ব্যান্ডে পরিবর্তন করে নিয়ে যায়। এবং এই পরিবর্তনটি হয়ে থাকে অনেক দ্রুত এবং নির্ভর যোগ্য। ফোনে আপনার ডাটা আদান প্রদান গতিতে এবং কানেকশনে কোন সমস্যা সৃষ্টি হয় না।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.