জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করার সময় সকল নাগরিকের কাছ থেকে আঙ্গুলের ছাপ নেয়া হয়েছিল যাতে প্রত্যেক নাগরিককে আলাদা আলাদা করে সনাক্ত বা চিহ্নিত করা যায়, এই আঙ্গুলের ছাপ সরকার কতৃক এনআইডি ড্যাটাবেইজে নিরাপদে সংরক্ষিত। মোবাইল  সংযোগের বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের সময় গ্রাহক যে আঙ্গুলের ছাপ দিচ্ছেন তা তাৎক্ষনিক সরকার কতৃক সংরক্ষিত এনআইডি ড্যাটাবেইজের সাথে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, কোনভাবেই এটা নতুন করে কোথাও সংরক্ষন করা হচ্ছেনা । কাজেই বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনে আপনি আসলে নতুন করে কিছুই দিচ্ছেননা, আপনি শুধু এটা নিশ্চিত করছেন যে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুকুলে ইস্যুকৃত মোবাইল সংযোগ আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ ব্যবহার করছেন।

Fingerprint

একজন সচেতন গ্রাহক মোবাইল সংযোগ কেনার জন্য রিটেইল পয়েন্টে যান এবং নির্ধারিত ফর্ম পূরণ করে রিটেইলারকে তার ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দেন। সঠিক নিয়মে মোবাইল সংযোগ বিক্রয় করার জন্য রিটেইলার মোবাইল অপারেটরের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট হারে কমিশন পান । কিন্তু কিছু অসাধু রিটেইলার বেশি কমিশন লাভের আশায়, গ্রাহকের অজান্তে তার প্রদত্ত ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের অনেকগুলো ফটোকপি (অনুলিপি) তৈরি করে তা দিয়ে একই বা অন্য অপারেটরের অনেকগুলো মোবাইল সংযোগ বিক্রয় বা চালু (অ্যাকটিভ) করে। এতে করে দেখা যায় একটা জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুকুলে অনেকগুলো মোবাইল সংযোগ বিদ্যমান এবং বেশির ভাগ সংযোগই জাতীয় পরিচয়পত্র বহনকারী ব্যক্তির আওতায় বা নিয়ন্ত্রনে নেই। প্রক্রিয়াগত এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা বা অপরাধীরা এই মোবাইল সংযোগগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আইনশৃঙ্কলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে এবং সমাজে অশান্তির  সৃষ্টি করছে। আর এই অপরাধের জন্য হয়রানীর শিকার হচ্ছে সেই সচেতন গ্রাহক যে কিনা নিয়ম মেনে মোবাইল সংযোগটি কিনেছিল। বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন চালু হওয়ার ফলে গ্রাহক যখন মোবাইল সংযোগ কিনবেন তখন তিনি সশরীরে উপস্থিত থেকে সরকার কতৃক সংরক্ষিত এনআইডি ড্যাটাবেইজের সাথে আঙ্গুলের ছাপ মিলিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। এক্ষেত্রে অসাধু রিটেইলার গ্রাহক প্রদত্ত জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি (অনুলিপি) তৈরি করে অন্য কারো কাছে মোবাইল সংযোগ বিক্রয় করা সম্ভব হবেনা । কাজেই বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে মোবাইল সংযোগ কেনা হলে একদিকে গ্রাহক যেমন অযথা হয়রানী থেকে রেহায় পাবেন এবং অপরদিকে এই প্রক্রিয়া আইনশৃঙ্কলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সহায়ক হবে।

আমরা যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করি যেমন অ্যাপল-এর আইফোন-সিক্স (সিক্স–এস) বা স্যামসাং এর গ্যালাক্সি এস-সিক্স (এস-সেভেন) কিংবা হুয়াওের মেইট-এইট ইত্যাদি ফোনে বায়োমেট্রিক ফিচার বিদ্যমান। এসব মোবাইল আনলক করতে কিংবা কোন নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশান চালু করতে আঙ্গুলের ছাপ ব্যবহৃত হয়। এই বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ফিচার ব্যবহার করতে হলে প্রথমে মোবাইল ব্যবহারকারী তার আঙ্গুলের ছাপ মোবাইল এ সংরক্ষন করেন এবং এই সংরক্ষন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বেশ কয়েকবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে হয়। পরবর্তীতে ব্যবহারকারী যখন মোবাইল আনলক করতে কিংবা কোন নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশান চালু করতে যে আঙ্গুলের ছাপ দেন তা আর নতুন করে সংরক্ষণ করা হয়না বরং তা আগের সংরক্ষিত আঙ্গুলের ছাপের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়।  মোবাইল সংযোগের বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনে ঠিক এমনটিই ঘটে, যখনই গ্রাহক আঙ্গুলের ছাপ দেন তাৎক্ষণিকভাবে তা সরকারের কাছে সংরক্ষিত এনআইডি ড্যাটাবেইজের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়, যদি মিলে যায় তবেই গ্রাহকের মোবাইল সংযোগ নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে গন্য হয়।

বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ফিচার এখন অনেক দেশেই ব্যবহার হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমীরাত এবং সৌদিআরব সম্প্রতি বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করেছে, সিঙ্গাপুরে প্রিপেইড সিম-এর ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বাধ্যতামুলক করা হয়েছে । নাইজেরিয়ায় ২০১১ সালে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড এ স্কুল এবং লাইব্রেরীতে প্রবেশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক উন্নত দেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটির বেশী ফেইসবুক ব্যবহারকারী। আমরা যখনই ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট খুলছি এবং আমাদের কোন ছবি প্রোফাইলে আপলোড করছি ঠিক তখনই ফেসবুক কতৃপক্ষ অ্যালগরিদম স্ক্যান বা ফ্যাসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে আপনার চেহারার স্ক্যান বা প্রতিচ্ছবি সংরক্ষন করে রাখছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে ফেইসবুকের ফ্যাসিয়াল রিকগনিশন আমেরিকার এফবিআই এর চেয়ে ও বেশী উন্নত, ফেইসবুকের ফ্যাসিয়াল রিকগনিশন ৯৭% সঠিক যেখানে এফবিআই এর ফ্যাসিয়াল রিকগনিশন ৮৫% সঠিক ফলাফল দেয়।

মোবাইল এখন একটি গণমুখী সেবা, মোবাইলের ব্যবহার শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে তা নয়, মোবাইল ব্যাক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। এতো গেল ভাল দিক, এই মোবাইল সংযোগ ব্যবহার করে আবার অনেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করছে, সমাজে শান্তি শৃঙ্কলা বিনষ্ট করছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষার হার, বেকারত্বের হার, অপরাধ প্রবণতা এবং অপরাধের ধরন সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আমাদের ভেবে দেখা উচিত এই বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন কতটুকু যুক্তিযুক্ত, কতটুকু সময়োপযোগী । বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন উদ্যোগ সফল হলে উপকৃত হবেন সাধারন গ্রাহক, কমবে অবৈধ আন্তর্জাতিক কল টারমিনেশন এবং বাড়বে সামাজিক নিরাপত্তা। তাই, শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে, আসুন, আমরা সরকারের প্রতি আমাদের সহযোগিতার হাত বাড়াই ।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.