একটি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ অন্যটি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানো স্যাটেলাইট (অন্বেষা ৩বি)। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বিচরণ করবে মহাকাশে ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপর দিয়ে। ন্যানো স্যাটেলাইটের বিচরণ ক্ষেত্র হবে এক থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার ওপরে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আগামী বছরের ১৬ ডিসেম্বর আকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে। আর ন্যানো স্যাটেলাইট একই বছরের মে মাসে উৎক্ষেপণ করবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। দু’টি স্যাটেলাইটই যোগাযোগ ও আবহাওয়া, একাডেমিক গবেষণাসহ ৪০ ধরনের কাজ করবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণ হচ্ছে রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সহযোগিতায় আর ন্যানো স্যাটেলাইট নির্মাণে জাপান সহযোগিতা দিচ্ছে। স্যাটেলাইট দু’টি উৎক্ষেপণ হলে দেশে তথ্যপ্রযুক্তির যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটবে।

সূত্র জানায়, বিটিআরসি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করার পর বাংলাদেশসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশ টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দেয়ার জন্য জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেমের (৪০টি ট্রান্সপন্ডার, ২৬ কেইউ ব্যান্ড, ১৪ সি ব্যান্ড) গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। প্রকল্পের ৪০ শতাংশ টাকা বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। বাকি ৬০ শতাংশ খরচ করবে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। তারা পরে স্যাটেলাইট থেকে আয় করা টাকা থেকে কিস্তি হিসেবে তাদের পাওনা নেবে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের জন্য অরবিটাল সøট ইজারা নেয়া। চুক্তির আওতায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব-দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল সøটের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারস্পটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনসকে দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে বিটিআরসি। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করতে মোট ৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে গত বছর সরকার এই প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা দিয়েছে। দাতা সংস্থা দেবে এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এই স্যাটেলাইটের দু’টি বেসস্টেশন থাকবে। বেসস্টেশন নির্মাণের কাজও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপন হলে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকলেও ব্রডকাস্টিং থেকে শুরু করে টেলিযোগাযোগের সব সেক্টর উন্মুক্ত হয়ে যাবে। বিদেশী স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। অন্যদিকে স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।

এদিকে, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির তিন শিক্ষার্থী কাফি, মাইসুন ও অন্তরা জাপানে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের পাশাপাশি স্যাটেলাইট তৈরি এবং তা উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের নির্মিত স্যাটেলাইট ২০১৭ সালের মে মাসে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে। জাপানের কিউসু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (কেআইটি) এবং বাংলাদেশের ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মধ্যে দেশের প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জিডিএলএন সেন্টারে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে উপাচার্য প্রফেসর সৈয়দ সাদ আন্দালিব এবং কেআইটির প্রফেসর মেংগু চো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বার্ডস নামক প্রজেক্টের মাধ্যমে এ ন্যানো স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। এজন্য এর নাম দেয়া হয়েছে অন্বেষা ৩বি (৩বি-বাংলাদেশ, ব্র্যাক ও বার্ডস প্রজেক্ট)।

ব্র্যাক সূত্র মতে, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব ম্যাথমেটিকস এ্যান্ড ন্যাচারাল সায়েন্সের চেয়ারপার্সন ও বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন কেন্দ্রের (স্পারসো) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আবদুল্লাহ জিয়াউদ্দিন আহমাদ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্ভব বলে মত প্রকাশ করেন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খলিলুর রহমান এই প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

ন্যানো স্যাটেলাইটে বাংলাদেশও হবে একটি উজ্জ্বল নাম। জাপানের কিউসু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (কেআইটি) ল্যাবরেটরি অব স্পেসক্র্যাফট এনভায়রনমেন্ট ইন্টারেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ড. আরিফুর রহমান খান এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশের জন্য ন্যানো স্যাটেলাইট খুবই লাভজনক হবে বলে মনে করেন ড. আরিফ। এর মাধ্যমে দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ আরও বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হবে বলে তিনি মনে করেন। ন্যানো স্যাটেলাইট নির্মাণ সম্পর্কে কাফি, মাইসুন বলেন, আমরা সব সময় চেষ্টা করি যাতে আমাদের কাজ কারও কাজে লাগে। কিন্তু আমরাই দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বানাতে পারব এটা কল্পনাও করতে পারিনি। আশা করব, আমাদের এ প্রচেষ্টা দেশের কাজে আসবে। অন্বেষা ৩বি-এর মাধ্যমে আমরা স্যাটেলাইটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি জিনিস খুব ভালভাবে শিখছি। অন্বেষা ৩বি স্যাটেলাইট আমাদের শেষ না, এটা দিয়েই আমাদের স্যাটেলাইট গবেষণা শুরু। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কাজ করে যেতে চাই যতক্ষণ না পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রযুক্তির শিখরে পৌঁছে দিতে পারি। স্বল্প ব্যয়ের ছোট্ট স্যাটেলাইটকে ন্যানোস্যাট বলা হয়। মহাকাশ গবেষণায় বাংলাদেশসহ পাঁচটি অনগ্রসর দেশে আন্তঃসীমান্ত প্রকল্প ‘বার্ডস প্রজেক্ট’ নিয়ে কাজ হচ্ছে।

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.