আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি খুব পরিচিত এবং ব্যবহৃত একটি জিনিস হচ্ছে প্ল্যাস্টিক। বাসা থেকে অফিস, বাজার সর্বত্র এর প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। কিন্তু কি এই প্ল্যাস্টিক ? প্ল্যাস্টিক হচ্ছে পলিইথিলিন এর একটি যৌগ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্ল্যাস্টিক এবং প্ল্যাস্টিক জাতীয় পণ্যগুলি পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা সংক্ষেপে পিইটি দ্বারা তৈরি।

মাসসাচুসেটস এর উডস হোল ওশেনগ্রাফিক প্রতিষ্ঠানে মেরিন মাইক্রোবায়োলজিষ্ট ট্রেসি মিন্সের যিনি সমুদ্রের প্ল্যাস্টিক নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। তিনি বলেন “যদি আপনি বাজারে বা সমুদ্রের তীরে যান প্রচুর পরিমাণে পিইটি(পলিইথিলিন টেরেফথালেট) দেখতে পাবেন।”

পিইটির অংশবিশেষ অর্থাৎ পিইটি যা দ্বারা তৈরি তা খুবই হাল্কা,বর্ণহীন এবং মজবুত এবং শুধু তাই নয় এটি যেকোন ধরণের মাইক্রোবস দ্বারা এর ক্ষয় করানো একটি সাধ্যাতীত ব্যাপার,যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে এটি পচনবিরোধী।বছরের পর বছর ধরে পলিইথিলিন অপচনশীল দ্রব্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

প্রতিবছর প্রায় ৫টনের কাছাকাছি প্ল্যাস্টিক এবং প্ল্যাস্টিক জাতীয় বর্জ্য তৈরি হয়,যার খুব অল্প পরিমান পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা হয় এবং সিংহভাগই ভূমিতে বা পানিতে পতিত হয় এবং পরিবেশগত ব্যাপক বিপর্যয় ও ক্ষতি সাধন করে।

পূর্বে গবেষণায় দেখা গেছে,কিছু মাইক্রোবস আছে যারা পিইটির উপর জন্মাতে পারে কিন্তু ভক্ষন বা ক্ষয় করতে পারে এমন কোন মাইক্রোবস পাওয়া যায় নি।

কিছু স্পেশালিস্ট ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে,যারা সেইসকল প্ল্যাস্টিক ভক্ষণ করে যা আমরা সাগরে ফেলে দিয়ে থাকি। উডস হোল ওশেনগ্রাফিক প্রতিষ্ঠানের মেরিন মেরিন মাইক্রোবায়োলজিষ্ট ট্রেসি মিন্সের এবং তার সহযোগীরা নর্থ আটল্যানটিকের সমুদ্রে গবেষণা এবং পরীক্ষা করেছেন যেখানে সমুদ্রের স্রোতের কারণে সামুদ্রিক বর্জ্য সেখানে জমা হয়।তারা সেখানে প্রায় ১১০০ টন প্ল্যাস্টিক এবং প্ল্যাস্টিক আবর্জনা পেয়েছেন।শুধু তাই নয়,সেই সকল প্লাস্টিকগুলোর উপরিতল প্রায় ক্ষয় হয়ে গেছে এবং সেখানে তারা ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান যা কিনা প্ল্যাস্টিক ভক্ষণ করছে এবং প্ল্যাস্টিক এর এরূপ ক্ষয়ের জন্য দায়ী।

মাইক্রোবায়োলজিষ্ট ট্রেসি মিন্সের আরও বলেন “ভূমিতে প্ল্যাস্টিক ভক্ষণকারী মাইক্রোবস পাওয়া গেছে কিন্তু সমুদ্রে এটিই প্রথম”

জাপানের একটি বিজ্ঞানী দল সম্প্রতি ব্যাকটেরিয়ার এমন একটি প্রজাতির সন্ধান পান যারা প্ল্যাস্টিক ভক্ষণ এবং ক্ষয় করতে পারে।প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ প্ল্যাস্টিক জাতীয় আবর্জনা তৈরি হয় তার সুরাহা করার জন্য এই ব্যাকটেরিয়া একটি যুগান্তকারী উপায়।

13153396_1714610175423083_322172009_n

কায়োটা ইনষ্টিটিউট অফ টেকনলজি এবং কিইয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি গবেষকদল পলি,মাটি এবং বর্জ্যজলসহ ২৫০টি ক্ষয়প্রাপ্ত এবং প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে এমন পিইটি সংগ্রহ করেন প্ল্যাস্টিক পুনরায় রাসায়নিক পদ্ধতিতে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা যায় এমন জায়গা থেকে।

পরবর্তীতে তারা তাদের সংগৃহীত স্যাম্পলের অনুসন্ধান চালাতে থাকেন এবং এক পর্যায় তারা কিছু মাইক্রোবস খুজে পান যেগুলো পিইটি ভক্ষণ করছে এবং সেই ভক্ষণকৃত পিইটিকে তারা তাদের শরীয় বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে।প্রথমে তারা পিইটি ফিল্মের বা পর্দার এই ক্ষয়ের কারণ হিসেবে ছারপোকা জাতীয় পোকার সাহচর্য বা সংক্রামণকে দায়ী ভেবেছিলেন।যদিও তারা পরবর্তীতে খুজে পেতে সক্ষম হন যে,ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রজাতি পিইটির এই ক্ষয়ের জন্যমূলত দায়ী।যার নাম তারা দেন-

Ideonellasakaiensis

পরবর্তীতে আরও গবেষণায় দেখা জায়,এই ব্যাকটেরিয়া পিইটি ভক্ষনের জন্য দুই ধরনের এনজাইম ব্যবহার করে।এনজাইম দুটির নাম পিইটিয়েজ এবং এমএইচইটিয়েজ যা কিনা পিইটি এবং এমএইচইটি (মন-৯২-হাইড্রক্সিইথাইল টেরাফথালিক এসিড) এর উপর কাজ করে।

প্রথমে ব্যাকটেরিয়া পিইটির সংস্পর্শে আসে এবং এনজাইম নিঃসরণ করে,যার ফলে একটি মধ্যবর্তী কেমিক্যাল তৈরি করে।কেমিক্যালটির নাম এমএইচইটি (মন-৯২-হাইড্রক্সিইথাইল টেরাফথালিক এসিড) যা এমএইচইটিয়েজ এনজাইমের প্রভাবে বিশ্লেষিত হয়।এই কেমিক্যালটি কোষে শোষিত হয় এবং আগের চেয়ে দ্রুত এনজাইম নিঃসরণ করে এবং দ্রুত পিইটির গঠন ভাঙ্গতে শুরু করে।এই ভাঙ্গনের ফলে কার্বন তৈরি হয় যা কিনা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।ব্যাকটেরিয়া এখান থেকে কার্বন সংগ্রহ করে দ্রুত বৃদ্ধি লাভ করে।

গবেষকরা আরও বলেন যে, Ideonellasakaiensisএই পদ্ধতিতে কাজ করে ৬ সপ্তাহে নিয়মিত ৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় পিইটি এর একটি পাতলা পর্দা ভক্ষণ করতে সক্ষম।বিজ্ঞানী মিন্সের বলেন “গবেষণাটি খুবই সাফল্যমণ্ডিত ছিল এবং এই মাইক্রোবসগুলো  খুব ভালোভাবেই প্ল্যাস্টিক ভক্ষণ করতে পারে”

জুন ইয়াঙ্ক একজন চীনা গবেষক তার ভাঁড়ারঘরে ভুট্টারপলি ব্যাগে কিছু ছিদ্র দেখতে পান।তিনি সেখানে মথ(এক ধরনের পোকা) এবং মথের লার্ভা পান।সেখানে তিনি খুজে পান যে, লার্ভাগুলি কোন না কোনভাবে প্ল্যাস্টিক হজম করছে।পরবর্তীতে তিনি এবং তার গবেষক টিম এই পোকার অন্ননালীতে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া পান,যারা প্ল্যাস্টিককে তাদের বৃদ্ধি সহায়ক উপাদান কার্বনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।

Plodiainterpuntellaমথের লার্ভার অন্ননালীতে বসবাসকারি ব্যাকটেরিয়া শুধু নয় পলিইথিলিন বিপাক করেনা,এরা নিজেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পলিইথিলিন বিপাক করে,পলিইথিলিনের প্রসারনীয় শক্তি ৫০ শতাংশ কমিয়ে,এর ভর ১০ শতাংশ এবং পলিমার চেইনের আণবিক ভর ১৩ শতাংশ কমিয়ে।

ইয়াঙ্ক এবং তার টিম, তারাই প্রথম যারা দেখিয়েছেন যে,ব্যাকটেরিয়া রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের ক্ষয় করতে পারে।শুধু তাই নয় তারা অন্যান্য গবেষকদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন যেন তারা অন্যান্য পোকামাকড়ের অন্ত্রে বসবাসকারী প্ল্যাস্টিক খাদক ব্যাকটেরিয়া খোঁজেন।

যদিও বিজ্ঞানীরা আর কোন মাইক্রোবস পাননি যাদের ভিতর পিইটি বিপাকের জন্য প্রয়োজনীয় সমগ্র এনজাইম একসাথে পাওয়া যায়নি।৯২ প্রকার মাইক্রোবস আছে যাদের শুধু এমএইচইটিয়েজ এনজাইম আছে আর ৩২ প্রকার এনজাইম আছে যাদের শুধু পিইটয়েজ এনজাইম আছে কিন্তু একসাথে এই এনজাইমগুলি কোন প্রজাতিতে পাওয়া যায় নি।

সমুদ্রের এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্যপদার্থ প্ল্যাস্টিক খাদক ব্যাকটেরিয়া নিঃশেষ করে ফেলছে।কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না, ব্যাকটেরিয়ার এই ভক্ষণ সম্পূর্ণ নিরাপদ কিনা ?তারা ভক্ষণ করে নতুন কোন ক্ষতিকারক উৎপাদ তৈরি করছে কিনা ? এমনকি তারা খাদ্য শৃঙ্খলে কোন ধরণের টক্সিন অনুপ্রবেশ করাচ্ছে কিনা??

ড.মিয়ামটোর মতে “যদি এটি একটি বিশাল সাফল্য তবু এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া এবং এর প্রয়োগ যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে ততটা সহজ হুবে না”

প্ল্যাস্টিক খাদক ব্যাকটেরিয়া একটি সাম্প্রতিক যুগান্তকারী আবিষ্কার।এর উপর এখনো গবেষণা চলছে।অদূর ভবিষ্যতে আমরা এর সম্পর্কে আরও বিস্ময়কর তথ্যপাবো বলে আশাবাদী এবং মানবকল্যাণে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হবে।

 

সৈয়দ কাউসার আহমেদ

বায়োটেকনলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.