কদিন আগে গিয়েছিলাম নারায়ণগঞ্জ। উদ্দেশ্য ছিলো কয়েকটি যায়গার ছবি তোলা, কিন্তু সেদিন বৃষ্টির কারণে রওনা হতে অনেক দেড়ি হয়ে যায়। ফলে ছবি তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি সবকটি স্পটের। এভাবে এলোমেলো ভাবে কথা না বাড়িয়ে গোড়া থেকেই শুরু করি।

দুপুরের পরপর বাসা (উত্তর বাড্ডা) থেকে যখন বের হই তখনও ঝিড়িঝিড়ি বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে। কোনো ট্যাক্সি বা সিএনজি না পাওয়ায় উঠে পরি ছালছাবিল বাসে। ছালছাবিল থেকে নামি যাত্রাবাড়ি, সেখান থেকে বাস বদলে নারায়ণগঞ্জের বাসে চেপে চলে আসি নারায়ণগঞ্জ। নারায়নগঞ্জের আশিয়ান এসি বাস কাউন্টারের সামনে নেমে রিক্সা নিয়ে চলে আসি হাজীগঞ্জ দূর্গে। আজকের প্রথম স্পট এই হাজীগঞ্জ দূর্গে। আসুন একটু জেনে নেই দুর্গ আসলে কি, এবং কেনো।

(পাশ থেকে হাজীগঞ্জ জলদুর্গের প্রবেশ তোরন)

মূলত দুর্গ গড়ে তোলা হতো আক্রমণ ঠেকাতে। সেই প্রাচীন কাল থেকেই, ঈশা খাঁ গড়েছিলেন মোগলদের ঠেকাতে। আবার মোগলরা গড়েছিলেন মগ, পর্তুগিজদের ঠেকাতে। তাছাড়া দেখা গেছে শৌর্যে-বীর্যে প্রতীক হিসেবেও প্রাসাদ দুর্গ গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো অনেকগুলি দুর্গ টিকে আছে, যার মধ্যে দুটি আছে নারায়ণগঞ্জে। একটি সোনাকান্দা দুর্গ আর আপরটি হাজীগঞ্জ দুর্গ। আজ এখানে আমরা দেখবো হাজীগঞ্জ দুর্গ।

(হাজীগঞ্জ জলদুর্গের বাহির প্রাচীর)

হাজীগঞ্জ দুর্গ আসলে একটি জলদুর্গ। তৎকালিন ঢাকাকে রক্ষা করতে নির্মাণ করা হয় “ট্রায়াঙ্গল ওয়াটার ফোর্ট” বা “ত্রিভুজ জলদুর্গে” । ১৬৫০ সালের কিছু আগে-পরে নির্মিত হয়েছিল এই সব দুর্গ। এই তিনটি জলদুর্গের একটি হচ্ছে হাজীগঞ্জ দুর্গ। অপর দুটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা জলদুর্গ ও মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর জলদুর্গ। প্রচলিতো বিশ্বাস অনুযায়ী কিল্লারপুলে অবস্থিত হাজীগঞ্জ জলদুর্গটি শায়েস্তা খাঁ নিমান করেন। শীতলক্ষ্যার পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত এই দূর্গটি থেকে সেই সময়ে নদীর দিকে নজর রাখা হতো বলেই এটিকে জলদুর্গ বলা হয়।

((ভিতর থেকে হাজীগঞ্জ জলদুর্গের প্রবেশ তোরন)

এটি একটি ইট-সুরকির তৈরি ছোট চতুর্ভুজাকৃতি দূর্গ। দুর্গটি বেশ চওড়া দূর্গ-প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। দুর্গের প্রাচীরে রয়েছে বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাবার ফোকর।

দূর্গের উত্তর দেয়ালেই দুর্গের একমাত্র প্রবেশ পথ “দুর্গ তোরণ”। কিছুটা উঁচু এই দূর্গে ঢুকতে হলে আপনাকে প্রবেশ তোরণের প্রায় ২০টি সিঁড়ি ডিঙ্গোতে হবে।

( প্রবেশ তোরন)


( প্রবেশ তোরন)


( প্রবেশ তোরন থেকে বাইরের দিকের রাস্তা)


( প্রবেশ তোরন থেকে বাইরের দিকের প্রাচীর)

আর তোরন থেকে দুর্গ চত্তরের নামতে হবে ৮টি ধাপ। প্রাচীরের ভেতরে চারদিকে চলাচলের পথ রয়েছে প্রাচীর ঘেষেই। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় দুটি বুরুজ যায়গা আছে। আরো একটি বুরুজ রয়েছে দক্ষিণ পাশে। তাছাড়া উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম কোনায় ছোট দুটি বুরুজ অংশ আছে, যেখানে এক সাথে কয়েকজন বন্দুক বসিয়ে গুলি চালাতে পারতো ।

( প্রবেশ তোরনের ভিতরের দিক)


( প্রবেশ তোরনের ভিতরের দিক)


( পাশ থেকে প্রবেশ তোরনের ভিতরের দিক)


(দুর্গপ্রাচীরের ভেতরের চলাচলের রাস্তা)


(দুর্গপ্রাচীরের ভেতরের চলাচলের রাস্তা)


(দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ কোনায় বড় বুরুজ)


(দুর্গের দক্ষিণ বুরুজ)


(একটি ছোট বুরুজ)

দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ কোনে রয়েছে চোকো একটি ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারে ঢোকার জন্য ছিলো ছোট্ট একটি পূর্বমুখী দরজা। ভেতরে ঠিক মাঝখানে একটি মোটা গোল পিলার, পিলারের সাথে ছিলো গোলাকার সিঁড়ি। আজ পিলারটি টিকে থাকলেও নিচের দিকের অনেকটুকু সিঁড়িই ভেঙ্গে গেছে। শুধিকি তাই! গোটা ওয়াচ টাওয়ারটি আজ বিলিন হ্য়ার পথে।

(ওয়াচ টাওয়ার)


(ওয়াচ টাওয়ার)


(ওয়াচ টাওয়ার)


(ওয়াচ টাওয়ার)


(ওয়াচ টাওয়ার)

http://i1122.photobucket.com/albums/l538/qshohenq/HaziGong48.jpg” alt=”” />
(ওয়াচ টাওয়ারের প্রবেশ দরজা)


(প্রায় বিলিন হয়ে যাওয়া সিঁড়ি)


(প্রায় বিলিন হয়ে যাওয়া সিঁড়ি)

এর আগে যখন গিয়েছি তখন দেখেছি দুর্গের ভেতরে গরু চড়ে বেড়াচ্ছে। এবার দেখলাম পাড়ার ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে, সেবারও দেখেছি খেলতে।

দুর্গে চত্তরের পশ্চিম দিকে আছে বেশ বড় একটি আমগাছ, আর পূর্ব পাশে আছে বড় একটি লিচু গাছ। লিচু গাছটি বিচিত্র ভাবে বেঁচে আছে তার অর্ধেক খয়ে যাওয়া দেহ নিয়ে।

(বুড়ো আম গাছ)


(অর্ধেক খয়ে যাওয়া লিচু গাছ)

পথের হদিস : ঢাকার যে কোনো স্থান খেতে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে, গুলিস্থান, যাত্রাবাড়ি বা কমলাপুর। গুলিস্থান বা যাত্রাবাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা ননএসি বাসে। ভাড়া পরবে ২৫ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে। আর কমলাপুর থেকে যাবেন ট্রেনে, ভাড়া ১০ টাকার বেশি নয়। কম-বেশি ৪৫ মিনিটে পৌছে যাবেন ঢাকা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ বাস বা বা ট্রেন স্টেশান থেকে ১৫ থেকে ১৮ টাকায় রিক্স ভাড়া নিবে হাজীগঞ্চ কেল্লা/ফোর্ট (কেল্লা বা ফোর্ট নাবললে ওরা চিনবে না)। ১০/১২ মিনিটেই পৌছে যাবেন হাজীগঞ্জ জলদুর্গে সামনে।

(এই পধ ধরেই হেঁটে যেতে হবে দুর্গে আর বেড় হওয়ার পথও এটিই)

বোনাসঃ হাজীগঞ্চ দূর্গের ৪০০ মিটার দক্ষিণেই রয়েছে বিবি মরিয়মের মাজার। দুর্গে যাওয়ার আগে সেটাও দেখে নিতে পারেন।

PDF


এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের ঝিঁঝি পোকার বাগানে নিমন্ত্রণ।

comments

11 কমেন্টস

  1. বহুত কষ্ট করেছেন…… ধন্যবাদ একটি সুন্দর লেখার জন্যে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.