একটা সময় ছিল প্রতিটি পাড়ায় মহল্লায় দেখা যেত ভিডিওর দোকান। কেউ কেউ নাম দিত, ভিডিও ক্লাব। সেখানে দেখা যেত ভারতীয় হিন্দি ফিল্মের বড় বড় পোস্টার, আবার কখনো কখনো হলিউডি ছবির পোস্টারও। কাঠের তৈরি তাকে থরে থরে সাজানো থাকতো ক্যাসেট। যে ক্যাসেট চলতো ভিসিআর বা ভিসিপিতে।

 

আরেকটি ব্যাপার ছিল, যাদের বাসায় বসে সিনেমা দেখার ইচ্ছে ছিল কিন্তু বাসায় নিজস্ব ভিসিআর বা ভিসিপি ছিল না এমনকি টিভিও না, তাদের জন্যে ভাড়ায় নেয়ারও ব্যবস্থা ছিল। সে সময় এটা অনেকটা পারিবারিক বিনোদনেরও একটা অংশ ছিল।

 

সপ্তাহে সপ্তাহে নতুন নতুন হিন্দি ছবি রিলিজ হতো আর সেগুলো গরম গরম দেখার মজা বা প্রতিযোগিতাই ছিল অন্যরকম। কেউ কেউ ছুটির আগের দিন রাতে মানে বৃহস্পতিবার এগুলো ভাড়ায় নিত। আবার কেউ কেউ ভাড়া নিত বাড়িতে কোনো আত্মীয় বেড়াতে এলে। ফলে মুরুব্বী শ্রেণীর কাছে এটা যেমন জনপ্রিয় ছিল ভারতীয় বাংলা ছবির জন্যে, তেমনি তরুণরা এতে দেখতো হলিউড বা বলিউডের ছবি। শিশুরাও বাদ যেত না এই বিনোদন থেকে। তখন এইসব ভিডিও ক্লাব বা দোকানে টম অ্যান্ড জেরি বা মিস্টার বিন কিংবা থ্রি স্টুজেস এর ক্যাসেটও ভাড়া পাওয়া যেত। ফলে গণমাধ্যমের পর এটাও একটা বিরাট মাধ্যম ছিল ঘরোয়া বিনোদনের।

 

যারা আশি কিংবা নব্বই দশকে ভিসিআরের রমরমা সময় বা যৌবন দেখেছেন তাদের জন্যে সংবাদটি খুব আবেগী। দীর্ঘদিনের প্রিয় বিনোদনের মাধ্যমটি এতোদিন অপেক্ষা করেছে তার শেষ নিঃশ্বাসের জন্যে। অবশেষে সেই সময় এলো।

 

ফুনাই, যারা এখনো এই যুগেও এই হারিয়ে যাওয়া যন্ত্রটি তৈরি করে যাচ্ছিল তারা ঘোষণা দিল অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এ মাসেই ভিসিআরের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ অনেকের কাছে নস্টালজিক এই ভিসিআর এখন থেকে আর নতুন পাওয়া যাবে না।

 

আমরা যেমন গ্রামোফোনকে পেয়েছিলাম আমাদের সময়ের শেষ নিঃশ্বাস নেয়া প্রযুক্তি হিসেবে। এবার বর্তমান প্রজন্ম পেল ভিসিআরকে। তবে ভিসিআরকে যে প্রযুক্তি প্রতিস্থাপন করেছিল সেও কিন্তু তার শেষের শুরু দেখতে শুরু করেছে। হ্যাঁ, ডিভিডি প্লেয়ারের কথাই বলছি। যদিও ডিভিডি প্লেয়ার বা ব্লুরে প্লেয়ার বাজারে এসেছে খুব বেশিদিন হয়নি অন্তত ভিসিআরের তুলনায়। তারপরেও তারা স্মার্টফোন এবং স্ট্রিমিং ভিডিও প্রযুক্তির কাছে নিজেদের শেষ দেখে ফেলছে।

 

জাপানের ফুনাই কোম্পানি তাদের উৎপাদন শুরু করেছিল ১৯৮৩ সালে। উৎপাদনের পর তারা এমন বছরও পার করেছে যে বছরে তারা দেড় কোটি ভিসিআর বিক্রি করেছে! গত বছরেও তারা ৭ লাখ ৫০ হাজার কপি বিক্রি করেছে। কিন্তু দিন দিন ভিসিআর তৈরির পার্টস পাওয়া দুস্কর হয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের উৎপাদন একপ্রকার বাধ্য হয়েই বন্ধ করতে হচ্ছে।

 

ভিসিআর বিশ্ব বাজারে আসে ১৯৬০ সালে। তবে এটা তখন আমেরিকার ধনীদের বিলাসী পণ্য ছিল। পরে জাপানের সনি কোম্পানিই প্রথম জনসাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসে ভিসিআর।

 

যাই হোক, জুলাই মাসেই আমাদের অনেকের প্রথম ও প্রধান বিনোদনের এই মাধ্যমের বিদায় ঘন্টা বাজছে। সংবাদ মাধ্যম সিএনএনের ভাষায়, রিপ (রেস্ট ইন পিস)- ভিসিআর!

 

 

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.