মেঘ মুক্ত রাতে আকাশের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই অনেক অস্পস্ট আলোর ছোপ এবং বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু অন্ধকার জায়গা, এগুলো হলো নীহারিকা (Nebula)। ফরাসী জ্যের্তিবিদ চার্লস মেসিয়ার যার গবেষনার বিষয় ছিল ধূমকেতু। এই ধূমকেতু বিষয়ে তার গবেষনার সন্দেহ দুর করার জন্য তিনি এই নীহারিকাদের একটি তালিকা তৈরী করেছিলেন।এই তালিকা থেকে আমরা দেখতে পাই এইরকম 103 টি নীহারিকা আছে।যে গুলো বর্তমানে এম ( M) অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয়।(পরবর্তীতে আরো অনেক নতুন তালিকা তৈরী করা হয়েছে, যেমন এন জি সি (NGC), কল্ডওয়েল ক্যাটালগ ইত্যাদি)।

এর মধ্যে সবগুলোই আমাদের ছায়াপথের নীহারিকা নয়,অন্য ছায়াপথের নীহারিকাও রয়েছে।এই নীহারিকারা হাইড্রোজেন গ্যাস ও মহাজাগতিক ধূলিকনা দিয়ে গঠিত।এই উপাদান তারার পদ্বতি হতেই সৃস্টি হয়,এবং এটা টুকরা হয়ে দুটি শ্রেনীতে ভাগ হয়ে যায়।এর একটি হচ্ছে নিক্ষিপ্ত (Defuse) বা নির্গত নীহারিকা অন্যটি হচ্ছে প্রতিবিম্ব (Reflection) নীহারিকা। আবার এর মধ্যে দুই রকমের নীহারিকা আছে যা সরাসরি মৃত তারাদের সাথে সম্পর্ক যুক্ত,এর একটি গ্রহ নীহারিকা (Planetary nebula) এবং অন্যটি নবতারা (Super Nova)।এছাড়াও আছে অন্ধকার নীহারিকা।

নিক্ষিপ্ত নীহারিকা (Diffuse):এই নীহারিকা খুবই উজ্জল।কারন এরা নিকটবর্তী তারাদের থেকে শক্তি শোষন করে এবং এভাবে পুনঃ পুনঃ দৃশ্যমান উজ্জল আলোর ন্যায় নির্গত হয় যা দর্শকের চোখে উজ্জল নীহারিকা হিসাবে ধরা দেয়।এই রকম একটি দৃস্টি আকর্ষক নীহারিকা বিক্ষিপ্ত নীহারিকা হচ্ছে এম-৪২ ( M42) বিখ্যাত কালপুরষের (Orion) নীহারিকা। কালপুরুষের তরবারির তারা অরায়নিসের চারিদিকে এই নীহারিটির অবস্হান।
http://www.itelescope.net/
ছবিঃ গুগল।

খালি চোখে এটিকে খুব অনুজ্জল আবছা আলোর ছোপের মত দেখা যায়।কিন্ত দুরবীন দিয়ে দেখলে একে অদ্ভুত সুন্দর দেখা যায়।এর ভিতরে অনেক খালি জায়গা দেখা যায় এবং এর অনেক শাখা প্রশাখা চারিদিকে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।এটি দেখতে অনেকটা সবুজ রংয়ের দেখা গেলেও ফটোগ্রাফিতে একে লাল দেখা যায়,কারন উওপ্ত হাইড্রোজেন গ্যাসের জন্য একে লাল দেখা যায়।প্রতক্ষ্য একে সবুজ দেখায় এর ভিতরে আয়োনিত অক্সিজেন গ্যাসের কারনে। বর্নালী বিশ্লেষনের মাধ্যেমে জানা যায় যে এই নীহারিকাটির মধ্যে অনেক উওপ্ত অতি দানব তারা আছে। যেমন থিটা অরিয়নস,এটি একটি মাল্টিপল তারা যাকে ট্রাপিজম (Trapezium) বলে।এই তারাদের আলোতে নীহারিকাটি আলোকিত হয়।

এই নীহারিকাটির মধ্যে পদার্থ প্রতি সেকেন্ডে 15 মাইল বেগে আলোড়িত হয়।এই জাতীয় নীহারিকার মধ্যে নতুন তারার জম্ন হয়,এবং M42 নীহারিকার মধ্যে জ্যের্তিবদরা তারা সৃস্টির প্রমান ও পেয়েছেন তাই এই নীহারিকাটিকে তারাদের আতুরঘড় (Star birth place) বলে।এর দুরত্ব প্রায় 1,000 আলোকবর্ষ,এর ব্যাস প্রায় 25 আলোকবর্ষ। এই নীহারিকাটি রাতের আকাশে সবচেয়ে সুন্দর ফটোগ্রাফি বস্তু।

প্রতিবিম্ব (Reflection) নীহারিকা: এই নীহারিকার চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা মহাজাগতিক ধুলিকনার উপর নিকটবর্তী তারার আলো ,ধুলিকনার মেঘের উপর পড়লে তা প্রতিফলিত হয় এবং নীহারিকাটি আলোকিত হয় ওঠে।নিক্ষিপ্ত ও প্রতিবিম্ব নীহারিকার গঠনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।প্রতিবিম্ব নীহারিকা সহজে দেখা যায় না।কিন্ত কৃক্তিকা (Pleiades) তারা গুচ্ছের ফটোগ্রাফিতে এর চারিদিকে এমনি নীহারিকা পরিবেস্টিত অবস্হায় দেখা যায়। এর ব্যাস প্রায় 50 আলোকবর্ষ।

গ্রহ নীহারিকা ও সুপার নোভা: এই দুই ধরনের নীহারিকা মৃত প্রায় তারার কারনে সৃস্টি হয়। শ্বেত বামন (White dwarf) পর্যায়ের একটি তারা মহাকর্ষ বলের টানে যখন সংকুচিত হতে থাকে তখন তারাটির বাইরের অংশ কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চারিদিকে বলয়ের আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন একে বলে গ্রহ (Planetary nebula) নীহারিকা। আবার শ্বেত বামনের চেয়ে বেশী ভর সম্পন্ন কোন তারা মাধ্যাকর্ষনের টানে সংকুচিত হয়ে, এমন একটি পর্যায়ে আসে তখন তারাটির কেন্দ্রের তাপ এতটাই বেড়ে যায়,যে তারাটিতে একটি বিস্ফোরন ঘটে এবং বাইরের অংশ ছিটকে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, একে বলে সুপার নোভা(Super nova)।এই রকম একটি সুন্দর সুপার নোভা নীহারিকা হলো বৃষ (Taurus) মন্ডলের কাঁকড়া নীহারিকা।আর সুন্দর একটি গ্রহ নীহারিকা হলো হেলিস্ক (Helix) গ্রহ নীহারিকা একে Eye of god ও বলে।

অন্ধকার নীহারিকা (Dark nebula): খালি চোখেই অনেক অন্ধকার নীহারিকা আমদের ছায়াপথে দেখা যায় । এই নীহারিকা তারার অভাবের জন্য হয় না।অধিকতর অগ্রবর্তী তারার অন্ধকারময় বস্তুপুন্জের ফল এই নীহারিকা (মহাকাশের সর্বএ ছড়িয়ে আছে বিশাল হাইড্রোজেন গ্যাস ও ধূলিকনার স্তর)।এই নীহারিকা গুলো সব সময় একই রকম অন্ধকার থাকে না।মাঝে মাঝে এদের কমবেশী অন্ধকার দেখায়।অন্ধকার নীহারিকা গ্যাস ও ধূলিকনা দিয়ে পরিপূর্ন এলাকা এই গ্যাস ও ধূলিকনা পরস্পর উচ্চ ঘনত্বে সম্পর্কযূক্ত।

আমাদের ছায়াপথের বেশীর ভাগ জায়গা জুড়ে এই ধূলিকনা ছড়িয়ে আছে।এই ধূলিকনা তারা পর্যবেক্ষনে বাধার সৃস্টি করে,এই ধূলিকনা দুরবর্তী তারা থেকে আগত আলোর অনেকটা শোষন করে নেয় যার ফলে তারাদের অনুজ্জল ও নিস্তেজ লাগে।আমাদের ছায়াপথের উওর থেকে দক্ষিনে প্রায় সর্বএই এই অন্ধকার নীহারিকা দেখা যায়।এইরকম একটি বিখ্যাত নীহারিকা হল “কয়লার খনি” (Cool sack) নীহারিকা।এটি আকাশের সর্বাপেক্ষা অন্ধকার নীহারিকা ,বিখ্যাত জ্যের্তিবিদ উইলিয়াম হার্শেল আকাশে এই নীহারিকাটি দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছলেন।তিনি এই নীহারিকাটি দেখে বলেছিলেন স্বর্গের ছিদ্র (Holes in the heavens),এটি Crux মন্ডলের প্রথম তারা (a-crucis) দক্ষিন পূর্বে অবস্হিত। এর দুরত্ব প্রায় 600 আলোক বর্ষ এবং ব্যাস 7 আলোকবর্ষ।

কালপুরুষ (Orion) মন্ডলে এই রকম আরও একটি বিখ্যাত অন্ধকার নীহারিকা আছে এর নাম অশ্বশির (Horse head nebula) নীহারিকা।কালপুরুষের কোমরের তিনটি তারার মাঝখানের তারা এপসাইলন আলনাইলাম (Alnilam) তারাটির ঠিক পিছনে এর অবস্হান।

বর্তমানে অত্যাধুনিক মহাকাশ দুরবীন ও অন্যান্য বিভিন্ন প্রযূক্তি ব্যাবহার করে নীহারিকার অনেক অজানা খবর জানা যাচ্ছে।ছায়াপথ থেকে যে রেডিও তর আসে তার উৎস এই নীহারিকারা আমাদের ছায়াপথে এইরকম একটি জোড়ালো রেডিও তরংগের উৎস আছে ক্যাসিওপিয়া তারা মন্ডলে।

আমাদের ছায়াপথের সম্পূর্ন ভরের 10% হাইড্রোজেন গ্যাস আর 0.09% ধূলিকনা।মহাকাশে এই রকম হাইড্রোজেন গ্যাস আর ধূলিকনা যদি না থাকতো,তাহলে এক সময় দেখা যেত মহাকাশের সব তারাই একসময় তার জ্বালানী শেষ করে মৃত্যু মুখে পতিত হতো।এবং এক পর্যায়ে রাতের আকাশে আর কোন তারাকে মিটমিট করে জ্বলতে দেখা যেত না।

এই নীহারিকারা মহাকাশে নতুন তারার সৃস্টি করছে।অসীম মহাকাশে ছড়িয়ে আছে আরো কত বিস্ময়।

অশ্বশির নীহারিকাটির ছবি তোলা হয়েছে GRS রিমোট দুরবীনের সাহায্যে।

comments

6 কমেন্টস

  1. ছবিতে যতটা দেখা যায় আসলে ততোটা সুনদর কখনোই দেখা যায় না। ঢাকার আকাশে এদের কখনোই খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢাকার বাইরে চেষ্টা করলে পাওয়া যেতে পারে হালকা আলোর ছোপের মতো। আমার ১৪৪mm টেলিস্কোপ রয়েছে, সেটা দিয়েও খুব সুন্দর কিছু দেখা যাওয়ার কথা নয়। তবে আপনার লেখা আর ছবি সহ উপস্থাপনা অতি চমৎকার হয়েছে।

  2. BIDU – latest company news, stock quote, historical share prices, splits, options, earnings, estimates, ratings, cash flow and market valuation for Baidu Inc. ADS.
    bai du

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.