বন্ধনের কথা শুনে সবাই নিশ্চয় একটু রস বোধ করছেন? রসায়ন মানেই রস আস্বাদনের ক্ষেত্র! আয়নিক, সমযোজী, সন্নিবেশ, ভ্যান্ডারওয়ালস বন্ধন পেরিয়ে নতুন আরেক রস আস্বাদনের ক্ষেত্র অর্থাৎ বন্ধনের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা হলো কম্পমশীল বন্ধন। যদিও, প্রায় ৩০ বছর পূর্বে এই বন্ধনের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা ধরতে পেয়েছিল কিন্ত যথাপোযুক্ত প্রযুক্তি আর প্রমাণের অভাবে তা অপ্রকাশ্যে ছিল।

সম্প্রতি কৃত্রিম আইসোটোপ ( যে সকল পরমাণুর একই প্রোটন সংখ্যা থাকে) নিয়ে এক গবেষনায় নতুন এই বন্ধনের অস্তিত্ব আবার উপস্থিত হয়েছে। যার গুনাগুণ প্রাচীন রসায়নের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এই গবেষণা নিয়ে Angenwandte chemie international edition নামক জার্মান রসায়ন জার্নালে ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিস কলম্বিয়ার ডোনাল্ড ফ্লেমিং এর নেতৃত্বে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

Untitledklk

আমরা জানি যে, যে কোনো মৌলের মূল পরিচয় বহন করে তার প্রোটন সংখ্যা। কোন কোন  মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে একই সংখ্যক প্রোটন থাকে  যদিও নিউট্রনের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন থাকে। আর পরমাণুর এই অবস্থাকে বলে আইসোটোপ। আর এই ধরনের পরমাণুর মানে আইসোটোপসমূহের মধ্যে এমন ভরের পার্থক্য মৌলসমূহের বন্ধন গঠনসহ আরো নানান ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। প্রাকৃতিক ও স্থিতিশীল আইসোটোপের সংখ্যা আমাদের প্রকৃতিতে কম নয়( যেমন টিনের ১০ টি এরকম আইসোটোপ আছে)। তবে কৃত্রিম আইসোটোপ আমরা ল্যাবেও সৃষ্টি করতে পারি। পরমাণুতে নিউট্রনের সংখ্যা অনেকটা অপরিবর্তিত রেখে প্রতিকণা যুক্ত করার মাধ্যমে এই কৃত্রিম আইসোটোপ তৈরী করা সম্ভব।

কম্পনশীল বন্ধনের গভীরে যাওয়ার পূর্বে এর প্রাথমিক পরিচয়টা জেনে নেই। কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষেএকটি ভারী পরমাণু আর হালকা পরমাণুর মধ্যে বিক্রিয়া ঘটানো হলে অনেক সময় দেখা যায় যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিক্রিয়ার দ্রুতি না বেড়ে না বেড়ে হঠাৎ করে কমে যায়। আর এই রহস্য উদঘাটনের জন্য বিজ্ঞানীরা বিক্রিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য উদ্যোগী হয়। যেখান থেকেই এই কম্পনশীল বন্ধনের অস্তিত্ব তাঁরা আমাদের সামনে তুলে ধরে। এই বন্ধন মূলত ভারী ও হালকা পরমাণুর যুক্ত হওয়ার ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে।

১টি প্রোটনযুক্ত হাইড্রোজেনের আইসোটোপ প্রোটিয়াম(1) এর মতই রাসায়নিক গুণাবলীসম্পন্ন বহিরাগত এক মৌল হল মওনিয়াম( Mu), এটি মূলত এক প্রকার হাইড্রোজেন আইসোটোপ। যার অ্যান্টি-মওন নিউক্লিয়াস একটি মাত্র ইলেকট্রন দ্বারা আবর্তিত হচ্ছে। অথচ এই মৌলটি প্রোটিয়ামের তুলনায় কিছুটা হালকা। ১৯৮৯ সালের কম্পনশীল বন্ধন নিয়ে এক পরীক্ষার সময় অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই মওনিয়ামের উদ্ভব। আমরা জানি, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিক্রিয়ার দ্রুতি বৃদ্ধি পায়। কিন্ত ব্রোমিন এবং মওনিয়ামের মধ্যে বিক্রিয়াকালীন সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের বিক্রিয়ার দ্রুতি হঠাৎ করে কমে যায়। যা কিনা মওনিয়ামের সাথে ফ্লোরিন কিংবা ক্লোরিনের বেলায় ঘটে নি। এ ঘটনা বিজ্ঞানীদের পরবর্তিতে উপযুক্ত প্রযুক্তির উপস্থিতিতে আরো গবেষণা চালানোর জন্য অপেক্ষায় রাখে। কেননা ১৯৮৯ সালে এই পরীক্ষা পর্যবেক্ষনের মত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির তখনও উদ্ভব ঘটে নি।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ফ্লেমিং ও তাঁর দল ইংল্যন্ডের রাদার ফোর্ড এপ্লিটন ল্যাবটরীতে ১৯৮৯ সালের অসমাপ্ত পরীক্ষাটি আবার করেন। তখন তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, যদিও মওনিয়াম এবং ব্রোমিনের মধ্যাকার বিক্রিয়া ভ্যান্ডারওয়ালস বন্ধনের মাধ্যমে হওয়ার কথা, প্রকৃতপক্ষে তাদের মধ্যাকার বিক্রিয়াকালীন বন্ধন যে কম্পনশীল বন্ধন, সেটিই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ডোনাল্ড ফ্লেমিং। হাইড্রোজনের ৩ টি প্রাকৃতিক আইসোটোপ (1H, 2H,3H) , আরেকটি ভারী হাইড্রোজেনের আইসোটোপ,মওনিয়াম ও ব্রোমিনের মধ্যে বিকিয়া ঘটানো হয়েছিল। এই বিক্রিয়া থেকে গবেষকেরা বিক্রিয়ার কোয়ান্টাম মেকানিজম পর্যবেক্ষণ করেন।

“ সবচেয়ে হালকা আইসোটোপ, BrMuBr এর সাথে Mu এর বিক্রিয়ায় এক সাম্প্রতিক গবেষণায় লক্ষ্য করা হয় যে Br2+Mu এর  পারষ্পরিক বিক্রিয়াকালীন সময়ে তাদের মধ্যে কম্পমান বন্ধনের সৃষ্টি হয়”, বলছিলেন ডোনাল্ড ফ্লেমিং। এছাড়া তিনি তাঁর এই পরীক্ষা থেকে দেখান যে, হালকা মওনিয়াম পরমাণু তার নিজস্ব কম্পনের দ্বারা ( নাচানাচির দ্বারাও বলা যেতে পারে!) অপেক্ষাকৃত ভারী ব্রোমিন পরমাণুর সাথে নিজেদের যুক্ত করে ফেলে এবং এর ফলশ্রুতিতে পুরো বিক্রিয়ার শক্তি হার কমে যায়।

 

জাপানের সাইটামা ইউনিভার্সিটি এবং ফ্রেই ইউনিইভার্সিটি অফ বার্লিনের রসায়নবিদরাও ডোনাল্ডের এই পরীক্ষা করে দেখেছেন আলাদা ভাবে।

“ আমদের BrMuBr এর পরীক্ষা নতুন বন্ধনের অস্তিত্বকে তুলে ধরে। এর সাথে সাথে কোনো আইসোটোপিক পরমাণু যে কিছু নির্দিষ্ট শর্তাধীনে গতানুগতিক রাসায়নিক বন্ধন পরিবর্তন করতে সক্ষম তা প্রমাণ করে। আমরা এই পরীক্ষায় যে সকল পরমাণুর আইসোটোপ ব্যবহার করেছি তারা একে অপরের থেকে গঠন আর বিশেষ করে শক্তির ধরন ও বন্ধন গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন”, বলছিলেন ফ্রেই ইউনিভার্সিটি অফ বার্লিনের জর্ন ম্যাঞ্জ। পরবর্তিতে সকলের ফলাফল, প্রমাণ আর মতামতের ভিত্তিতে রসায়নের জগতে এই নতুন কম্পনশীল নামক অস্থায়ী বন্ধনের আবির্ভাবকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই ঘটনা মওনিয়াম আর ব্রোমিন ছাড়াও অন্য ভারী এবং হালকা মৌলের ক্ষেত্রে ঘটে নাকি তা নিয়ে পরীক্ষা জারি রাখা হবে।

সুতরাং এই নতুন বন্ধনের দ্বারা আমরা কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তের অধীনে তাপমত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিক্রিয়ার দ্রুতি না বেড়ে কেনো কমে যায় তার রহস্য ভেদ করতে সক্ষম হব এর সাথে নতুন আরেক রস আস্বাদনেও।

তথ্য সুত্রঃ

১. লাইভ সায়েন্স

২. Chemistry.about.com/od/chemicalbond/fl/vibrational-bond-new-type-of-chemical-bonding.htm

 

লেখকঃ ফাতেমা-তুজ-জহুরা

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রসায়ন বিভাগ।

comments

কোন কমেন্ট নেই

LEAVE A REPLY

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.