আদালতে লাগছে প্রযুক্তিরে ছোঁয়া। আদালতে ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে সাক্ষীর সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা হবে। ওইসব আদালতে হাতে আর কোন সাক্ষীর জবানবন্দি লেখা হবে না। বিচারক, রাষ্ট্র, আসামি এবং বাদি-বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের সামনেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্পিউটার থাকবে। আদালতের কম্পিউটার কম্পোজকারী সাক্ষীর জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই সকল পক্ষ তাদের সামনে থাকা কম্পিউটারের মনিটরে তা দেখতে পাবেন। নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে কিনা তাও তারা পরীক্ষা করতে পারবেন। এছাড়া সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালতের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত কপি সকল পক্ষকে সরবরাহ করা হবে। বাংলাদেশের আইন আদালত এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা স্বপ্ন মনে হলেও ইতিমধ্যে গত ২ মার্চ এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে সিলেটের মহানগর দায়রা জজ, জেলা দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদলতের ২০টি কোর্টে। দেশব্যাপী একই সেবা চালু করার জন্য আগামী শনিবার সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ বৈঠক বসছে। এতে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার বাছাই করা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করবেন।

digital-lawবচার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলায় সাক্ষীর সাক্ষ্য সনাতন পদ্ধতি অর্থাৎ হাতে লিখে লিপিবদ্ধ করেন বিচারকরা। দিনের পর দিন এভাবে তারা সাক্ষ্য গ্রহণ করে থাকেন। সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর চলে জেরা। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষীকে জেরা করেন। আর এই জেরাও বিচারকদেরকে হাতে লিখে লিপিবদ্ধ করতে হয়। ফলে সাক্ষ্য ও জেরা লিপিবদ্ধ করতে প্রচুর সময় ব্যয় হয়। এছাড়া বাদি বা আসামি পক্ষও নানা সময়ে অভিযোগ করে থাকেন যে যথাযথভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ লিপিবদ্ধ হয়নি। দীর্ঘদন পর এই সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে দেশের সকল আদালতে চালু হচ্ছে ডিজিটালাইজড পদ্ধতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ। এই পদ্ধতিতে ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলায় যখন কোন সাক্ষী সাক্ষ্য দেবেন তখন একজন স্টোনোগ্রাফার বা স্টোনোটাইপিস্ট তা কম্পিউটারে লিপিবদ্ধ করবেন। সাক্ষ্য গ্রহণের সময় যদি ভুল কিছু লিপিবদ্ধ হয় তাহলে সাক্ষী বা তার আইনজীবীর তাত্ক্ষণিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা সংশোধনের সুযোগ থাকছে। ফলে কোনো তথ্য বাদ যাওয়া কিংবা ভুল লেখার আশংকা থাকবে না।

সুপ্রিম কোর্টের সহযোগিতায় জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউএনডিপি) অর্থায়নে জুডিসিয়াল স্ট্রেনথেনিং প্রজেক্টের (জাস্ট) আওতায় বিচার বিভাগে এই ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম চালু হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাচীন বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে আধুনিক ও যুগপযোগী করার লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় সময়, শ্রম ও অর্থের খরচের পরিমাণ কমিয়ে বিচারপ্রার্থীদের কষ্ট লাঘব করবে। যদিও এসব সেবা চালু করার আগেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু থেকেই আধুনিক পদ্ধতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাইব্যুনালের বিচারকগণের সামনে তিনটি, প্রসিকিউটর ও আসামি পক্ষের আইনজীবীর সামনে দুটি মনিটর এবং স্টোনোগ্রাফারের সামনে মূল কম্পিউটার রক্ষিত থাকে। সাক্ষী জবানবন্দি বা জেরার কোন অংশ ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের নির্দেশও দেন বিচারকরা।

এদিকে, অনলাইনে বেইল কনফারমেশন, দৈনন্দিন কার্যতালিকার (কজলিস্ট) পর এবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে তথ্য বাতায়ন (জুডিশিয়াল পোর্টাল) পরিচালিত হবে। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট এককভাবে পরিচালনা করবে। বাতায়নটি চালু করতে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালাসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এতে করে এক ক্লিকেই দেখা যাবে পুরো বিচার বিভাগ। দেশের যেকোনো প্রান্তে বসেই জানতে পারবে উচ্চ আদালতসহ ৬৪ জেলার বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমসমূহ।

জানা গেছে, তথ্য বাতায়নে থাকবে বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট আইন কমিশন, বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, সার্ভিস কমিশন ও আইন মন্ত্রণায়লসহ সকল প্রতিষ্ঠানের লিংক দেয়ার পাশাপাশি ৬৪ জেলার আলাদা আলাদা তথ্য থাকবে। সংশ্লিষ্ট জেলায় সকল আদালত, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য, সংশ্লিষ্ট অফিসের ফোন নম্বর, জেলার কারাগার সম্পর্কিত তথ্য, জেলার মানবাধিকার সংস্থার তথ্য, জেলার লিগ্যাল এইডের তথ্য, মামলা দায়েরের পদ্ধতি, কোন মামলায় কোর্ট ফি কত, আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রম, মামলার পরিসংখ্যান, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বদলিসহ যাবতীয় তথ্য। যাতে সবাই এখান থেকেই যেকোন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে পারে। পরীক্ষামূলক এটিকে চালু করতে একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

পোর্টালটিতে গিয়ে বিচার বিভাগীয় তথ্য জানতে পাওয়া যাবে। এছাড়াও এতে রাখা হয়েছে, উচ্চ আদালত, আইন ও বিচার বিভাগ, অধঃস্তন আদালত, অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থাপনা। এছাড়াও বিচার বিভাগ, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা, আইন ও বিধি, অর্জন, যোগাযোগ, ফটোগ্যালারি ও মতামতের বিষয়। অভ্যন্তরীণ সেবার মধ্যে রয়েছে, কার্যতালিকা (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ), সুপ্রিম কোর্ট বুলেটিন, নিম্ন আদালত কার্যতালিকাসমূহ।

প্রসঙ্গত, প্রধান বিচারপতি হিসেবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বিচার বিভাগে ডিজিটালাইজেশনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। উচ্চ আদালতে অনলাইন কার্যতালিকা, অনলাইন বেইল কনফারমেশন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ (সিলেটে পরীক্ষামূলক চালু), অনলাইন বুলেটিন (ল’ রিপোর্ট) উল্লেখযোগ্য। সর্বশেষ চালু হতে যাচ্ছে বিচার বিভাগীয় তথ্য বাতায়ন। সুপ্রিম কোর্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের অন্যান্য বিভাগের মতো বিচার ডিজিটালাইজেশনের অংশ হলো তথ্য বাতায়ন। এটা চালু হলে একদিকে যেমন বিচারকার্য সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের পুরো ধারণা পাবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের বিচারিক সুবিধা বাড়বে।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.