আমরা প্রায়ই বলে থাকি, কাজ না থাকলে গিয়ে ঘোড়ার ঘাস কাট! গবাদিপশুর খাদ্য বলেই কিনা সমাজে ঘাসের খুব একটা কদর নেই। এর আরেকটি কারণ অবশ্য আছে আর সেটা হলো, এই ঘাস যেখানে সেখানে জন্মায়। ফলে যে জিনিস বেশি দেখা যায় তার কদর কম থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

 

কিন্তু ইংল্যান্ডের কিছু বিজ্ঞানী এই ঘাসকেই এখন  পরিণত করতে যাচ্ছে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে। তারা গবেষণা করে সফল হয়েছেন ঘাস থেকে প্রচুর পরিমানে হাইড্রোজেন বের করতে। আর আমরা সবাই জানি হাইড্রোজেন হচ্ছে জ্বালানি গ্যাসের (মিথেন) প্রধান উপাদান। হাইড্রোজেন পানিতেও প্রচুর আছে। কিন্তু তাকে অবমুক্ত করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল। এছাড়াও হাইড্রোজেন প্রকৃতিতে আরো কিছু উপাদানে আছে কিন্তু সেটাও খুব সহজলভ্য নয়। তাই ঘাস থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন একটি বিশাল ব্যাপারই বলা চলে। তাও খুব সহজে এবং সস্তায়।

 

ইংল্যান্ডের কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির কার্ডিফ ক্যাটালিস্ট ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এটা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে একটি জার্নাল প্রকাশ করেছেন। সূর্যের আলোর সঙ্গে ঘাস এবং কিছু ধাতব অনুঘটকের বিক্রিয়ায় উৎপাদিত গ্যাসই মূলত এই হাইড্রোজেন গ্যাস। যা থেকে বিজ্ঞানীরা নবায়নযোগ্য জৈব জ্বালানির ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছেন।

 

পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই ঘাস প্রায় অনাদরেই পরে থাকে। তাই এই পরিত্যক্ত বা অচ্ছুৎ ঘাস দিয়ে যদি বিশ্বের এক নম্বর সমস্যার সমাধান খুব কম খরচে এবং সাধারণ প্রযুক্তিতে করা যায় তবে এটা আগামীর জন্য খুব সুখবর বয়ে আনবে।

 

কেননা অজৈব জ্বালানির বা খনিজ জ্বালানির একটা নির্দিষ্ট মজুত আছে। কোনো না কোনো সময় মানুষকে জৈব জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানীতে ঝুঁকতেই হবে। ফলে এতো সহজলভ্য উপাদান এবং প্রযুক্তি কিন্তু আমাদের আশার আলোই দেখাচ্ছে। অন্তত ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা তেমনটাই মনে করছেন।

 

আর আরো সম্ভাবনার কথা হলো এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাপ্য হাইড্রোজেন খুবই পরিবেশবান্ধব। এই হাইড্রোজেন কোনো রকম বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায় না বা এর থেকে কোনো গ্রিন হাউজ গ্যাসের প্রভাবও পরবে না। গবেষকরা একেই দেখছেন বিরাট প্রাপ্তি হিসেবে। কেননা এ যাবৎ কালে হাইড্রোজেন গ্যাস অনেক ভাবেই আহরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তা ছিল তুলনামূলক ব্যয়বহুল।

 

বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়ার অনুঘটক হিসেবে তিনটি ধাতবকে ব্যবহার করেছেন যথা সোনা, প্যালাডিয়াম এবং নিকেল। দামে সস্তা হওয়ায় নিকেলকেই এর মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারণ এই তিনটি ধাতবের ভেতর নিকেলই সহজলভ্য এবং সস্তা।

 

রিসার্চ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রফেসর মাইকেল বুকার বলেন, ‘এটা সত্যিকার অর্থেই শক্তির সবুজ উৎস।’ এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলা হয় হয় ফটোরিফর্মিং বা ফটোক্যাটালাইসিস। এতে সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে ঘাসের সঙ্গে অনুঘটকের বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করা হয়। পৃথিবীতে প্রচুর পরিমানে হাইড্রোজেন আছে, যেমন পানি, হাইড্রোকার্বন এবং আরো অনেক জৈব পদার্থে এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এ সকল উপাদান থেকে সহজেই তা আহরন করা যায় না।

 

গবেষক দল একটি গোলাকার ফ্লাস্কের তলায় ঘাস এবং উল্লেখিত তিনটি ধাতবের অনুঘটককে একটি মিশ্রণে পরিণত করে সূর্যের আলোয় ৩০ মিনিট রেখে সেখান থেকে উৎপাদিত গ্যাস সংগ্রহ করেন। যা খুবই ভালো মানের হাইড্রোজেন গ্যাস এবং যা থেকে কোনো দূষণ ছড়ায় না।

 

প্রফেসর বুকার আরো বলেন, যদিও এই পরীক্ষা নিরীক্ষা এখনো খুব গভীর ভাবে গবেষণা করা হয়নি। তারপরেও এই রিসার্চ থেকে আমরা খুব স্বল্প ব্যয়ে প্রচুর পরিমানে হাইড্রোজেন উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা আমরা সম্ভব করতে পেরেছি আমাদের বাগানের বা আঙিনার ঘাস থেকেই। তাই এর বিস্তর গবেষণা হয়তো আমাদের জন্যে উজ্জল সম্ভাবনার দুয়ারই খুলে দেবে। কেননা সবুজ এই দেশে ঘাসের যে কোনো অভাব নেই।

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.