আমাদের দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রতিভা, সুধু অপেক্ষা তাদের খুঁজে বের করার। বিগত দিনেও আমরা এমন অনেক আবিষ্কার দেখেছি যেগুলো শুধুমাত্র পৃষ্টপোষকতার অভাবে আলোর মুখ দেখেনি।

তবে আমরা যথেষ্ট আশাবাদী মুন্নার নতুন এই আবিষ্কার নিয়ে যেটি ইতিমধ্যে সরকার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নজরে এসেছে। মুন্নার এই প্রকল্পটি এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকার অনুদনাও পেয়েছে। এবং সেটি ব্যবহার সে তার বাইকটি আরও উন্নত করতে সামর্থ্য হয়েছে।

গত ২৭ জুলাই বাংলানিউজ২৪.কম মুন্নার গ্যালাক্সি বাইক নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং তারপরই প্রযুক্তিটি সবার নজরে আসে।

আপনাদের সুবিদার্থে প্রতিবেদনটি এখানে তুলে ধরা হল-

মুন্না চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র। বিভিন্ন কিছু আবিষ্কারের জন্য তার কলেজ ও এলাকায় তিনি ‘বিস্ময় বালক’ হিসেবে পরিচিত।

মুন্নার দাবি, বৈদ্যুতিক চার্জে চালিত তার অাবিষ্কৃত গ্যালাক্সি বাইকে কিলোমিটার প্রতি খরচ হবে মাত্র ৩৫ পয়সা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে খরচ হতো ২ পয়সা।

সম্প্রতি মুন্নার আবিষ্কৃত গ্যালাক্সি বাইক বা মোটরসাইকেলের মেকানিক্যাল আরও আপডেট করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি) ৮ লাখ টাকার বৃত্তি ঘোষণা করেছে।

মুন্না বাংলানিউজকে বলেন, বুয়েটের একটি প্রতিনিধিদল আমার আবিষ্কৃত জ্বালানিবিহীন মোটরসাইকেলের বিভিন্ন দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। প্রতিনিধিদলটি আমাকে উৎসাহও দিয়েছে। মেকানিক্যাল দিক আপডেটেড করতে আরও অর্থ বৃত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশও করেছে প্রতিনিধি দলটি।

মুন্নার ভাষ্য মতে, তার অাবিষ্কৃত মোটরসাইকেলে ১০টি এন্টিকাটার রয়েছে। প্রতি এন্টিকাটারে ১০ কিলোমিটার করে একবার চার্জে ১শ’ কিলোমিটার পথ যাবে। একবার চার্জে খরচ হবে ৩ থেকে ৪ টাকার বিদ্যুৎ। ৪৫ কিলোমিটার গতিতে মোটরসাইকেলটি চললে ব্যাটারি অটো চার্জ হবে। এতে আরও ৩০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করা সম্ভব হবে।

দেশীয় প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই এ মোটরবাইক তৈরিতে খরচ হবে মাত্র ৫০ হাজার টাকা। প্রতিবছর ১০ হাজার মোটরসাইকেল তৈরি করা যাবে বলে জানান মুন্না। মেকানিক্যাল দিক আরও আপডেটেড করা গেলে মোটরসাইকেল তৈরি ও কিলোমিটার প্রতি খরচ আরও কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় মোটরবাইকটি স্বল্পমূল্যে বাজারজাত ও বিদেশে রফতানি করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এ খুদে বিজ্ঞানী।

মুন্না বলেন, এর চাকা অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি। চাকাতে রয়েছে ড্রাম ব্রেক সিস্টেম। বডির স্টিল ও সিট ক‍ভার নিজের তৈরি। অন্য যন্ত্রাংশ সাধারণ মোটরসাইকেলের মতোই।  তার সতেরটি জিনিস আবিষ্কারের মধ্যে মোটরসাইকেল ইউনিক আবিষ্কার। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রেখে এটি বাজারজাত করাই এখন তার মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, বেশ কয়েকটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে এটি তৈরি ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রযুক্তিটি কাজে লাগানোর আশ্বাস দিয়েছে তারা।

এ গবেষণায় প্রাপ্ত ফেলোশিপ (বৃত্তি) প্রসঙ্গে মুন্না বলেন, আবিষ্কৃত মোটরসাইকেলের প্রযুক্তি আরও আপডেটেড করতে আইসিটি বিভাগ বৃত্তি
দিয়েছে। প্রথম কিস্তিতে ৪ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। গবেষণার অগ্রগতি দেখে আরও ৪ লাখ টাকা দেবে। তবে এ টাকা দিয়ে কিছুই হবে না।  তার গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করতে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অনুরোধ জানান প্রতিভাবান এ খুদে বিজ্ঞানী।

মোটরসাইকেলের পাশাপাশি যুদ্ধ বিমান, বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিনব কৌশল আবিষ্কারসহ বেশ কিছু নতুন বিষয় নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করছেন মুন্না। মোটরসাইকেল আবিষ্কার প্রসঙ্গে মুন্না বলেন, ২০১৪ সালের ৩০ অক্টোবর মাত্র দেড় মাসে এ মোটরসাইকেলটি আমি আবিষ্কার করি।

বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে মাছ চাষ করতেন মুন্না ও তার পরিবারের লোকজন। দীর্ঘ এ পথ তাকে প্রতিদিনি পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করে বাইসাইকেল চালিয়ে যেতে হতো। পরিশ্রম, অর্থ আর সময় সাশ্রয়ের ভাবনা থেকে পাওয়ার সেভিং ও ফুয়েল ফ্রি মোটরসাইকেল আবিষ্কারের চিন্তা ঢুকে তার মাথায়। সেই চিন্তা থেকেই এই মোটরসাইকেল আবিষ্কার। তার আবিষ্কার দেখে স্থানীয় মানুষের মাঝে হৈ চৈ পড়ে যায়।-যোগ করেন মুন্না।

তিনি বলেন, লাইট, টায়ার ছাড়া সব নিজের তৈরি। বিনিয়োগ সহায়তা পেলে এগুলোও তৈরি করা যাবে। এ মোটরবাইকের ১৮ মাসের আগে ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হবে না।  মোটরসাইকেল নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্ক মুন্না বলেন, প্রথমে নিজের জন্য এটি তৈরি করি। চালাতে গিয়ে মানুষের আগ্রহ দেখে বাজারজাত করার চিন্তা আসে।

অনেকেরই মোটরসাইকেল কেনার তীব্র আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু তেল, মবিল, ফুয়েল খরচ এবং রক্ষাণাবেক্ষণের জন্য আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাদের কথা চিন্তা করে তার এ আবিষ্কার। এ মোটরসাইকেল ব্যবহারে মাসিক মেরামত খরচ নেই বললেই চলে। ফুয়েল, তৈল কেনার ঝামেলামুক্ত। শুধু মাসিক বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলেই চলবে।

এতে সাধারণ মোটরসাইকেলের মতো দু’চাকায় ড্রাম ব্রেক রয়েছে। ফলে রিস্ক নেই। সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে ফ্যাক্টরি করার পরিকল্পনা আছে বলে জানান তিনি। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মোবাইলের মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো স্থান থেকে যে কোনো মেশিন নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তি আবিষ্কার করে সবার নজরে আসে মুন্না।

মুন্না বলেন, আমাদের একটি রাইস মিল ছিল। পরীক্ষামূলকভাবে যে কোনো জায়গা থেকে মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে মিলটি কন্ট্রোল করতাম। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেই প্রযুক্তিটি কাজে লাগাতে পারিনি।

মুন্না ২০১০ সালে গুদামে পানি উঠলে মালিককে মোবাইল কলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানানোর যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে পানির ট্যাংকি অটো ভর্তি ও খালি করার যন্ত্র, পানির মধ্যে গাড়ি চালানোর যন্ত্র, ঘরের তাপমাত্রা মেপে ইচ্ছামতো ফ্যান চালানো ও বন্ধ করা যন্ত্র, মসলা মিলিং করার যন্ত্র, গমের খোসা ছাড়িয়ে ময়দা মিলিং করার যন্ত্র আবিষ্কার করেন বলে তিনি দাবি করেন।


তার বিমান তৈরির জন্য রেডিয়াল ইঞ্জিন ও জেট ইঞ্জিন ডিজাইন ও টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরির যন্ত্র আবিষ্কার প্রক্রিয়াধীন।

পুকুরে অক্সিজেন তৈরির যন্ত্র, বাইসাইকেলকে মোটরসাইকেলে রূপান্তর, সর্বশেষ পাওয়ার ও ফুয়েল সেভিং ‘গ্যালাক্সি বাইক’ (মোটরসাইকেল) আবিষ্কার করে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। সড়কে নাশকতা মনিটরিংয়ে চার প্রফেলার বিশিষ্ট ড্রোন আবিষ্কার। যার ফ্লাইং টাইম ৪-৫ মিনিট। পেট্রোল বোমা থেকে গাড়িকে রক্ষার জন্য গ্লাস প্রটেক্টর তৈরি করার ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি।

আইসিটি মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে মুন্না বলেন, মোটরসাইকেল আবিষ্কারটি এ মন্ত্রণালয়ের জন্য আলোর মুখ দেখছে। আমার সব আবিষ্কার যেন আলোর মুখ দেখে সে প্রতিক্ষায় আছি। বাবা তাজুল ইসলামের অনুপ্রেরণা ও আর্থিক সহায়তায় মুন্নার এসব গবেষণা চলছে। এর আগে কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তার সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। তবে এবার মুন্না তার অবিষ্কৃত ‘গ্যালাক্সি বাইক’ নিয়ে নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।

 

সূত্রঃ বাংলানিউজ২৪.কম

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.