মনুষ্য জগতের ন্যায় সংখ্যার জগৎটাও বড় বিচিত্র। এই দুই জগতের মধ্যে বিস্তর প্রভেদ আছে সত্য, তবে আমার কাছে আকর্ষণীয় পার্থক্য মূলত একটাই …………. মনুষ্য জগৎ সীমিত আর সংখ্যার দুনিয়া অসীম, অনন্ত। এই সীমাহীন সংখ্যার দুনিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক আলোচিত সংখ্যার নাম মৌলিক সংখ্যা। সংখ্যাকে ভালোবাসে অথচ মৌলিক সংখ্যার প্রেমে পড়েনি এমন নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত গণিতের ইতিহাসে দুর্লভ।

ল্যাটিন ‘primus’ শব্দ থেকে ‘prime’ শব্দটির উৎপত্তি। ‘primus’ শব্দটির অর্থ হল ‘first in importance’ অর্থাৎ গুরুত্বানুসারে প্রথম। আসল মৌলিক সংখ্যা হলো, এক অপেক্ষা বৃহত্তর প্রতিটি অখন্ড সংখ্যার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ প্রতিটি সংখ্যা হয় মৌলিক সংখ্যা নতুবা মৌলিক সংখ্যার গুণফল।

অপর সকল সংখ্যাকে মৌলিক সংখ্যার গুণফল আকারে প্রকাশ করা গেলেও কোনো মৌলিক সংখ্যাকে এক এবং সেই সংখ্যার গুণফল ছাড়া অপর কোনোও সংখ্যার গুণফল দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। আর এখানেই মৌলিক সংখ্যার মৌলিকত্ব। কাজেই এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মৌলিক সংখ্যা মাত্রেই বিজোড় সংখ্যা হবে। অবশ্য সবকিছুরই ব্যতিক্রম হয়। এক্ষেত্রে 2 হলো একমাত্র ব্যতিক্রমী সংখ্যা যা মৌলিক হয়েও জোড়। প্রসঙ্গত, 2 কেবল ব্যতিক্রমী চরিত্র নয়, মৌলিক পরিবারের কনিষ্ঠতম (ক্ষুদ্রতম) সদস্যও বটে।  অগণিত মৌলিক সংখ্যার অগণন প্রকারভেদ। তাদের মধ্য থেকে আমার পছন্দের কয়েকটি বিশেষ ধরণের মৌলিক সংখ্যার কথা এখানে বলব।

বৃহত্তর মৌলিক সংখ্যা (Largest Prime Number)  

ক্ষুদ্রতম মৌলিক সংখ্যা ২ তা তো জানলাম। কিন্তু বৃহত্তর মৌলিক সংখ্যাটি কত? সেই কবে ইউক্লিড বলেছিলাম, ‘বৃহত্তম কোন মৌলিক সংখ্যা নেই (there is no largest prime number)।’ তাঁর কথা আজও অভ্রান্ত। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার কল্যাণে গণিতজ্ঞদের বুদ্ধির জালে সময়ে সময়ে দু একটা বড় বড় মৌলিক সংখ্যা ধরা পড়েছে বটে, তবে তাকে বৃহত্তম বলা যায় না। কারণ, 2008  সালের আগস্ট মাস থেকে 2015 সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত বৃহত্তম মৌলিক সংখ্যার স্থান দখল করে ছিল 243’112,609–1 সংখ্যাটি, কিন্তু তারপর সেই স্থান চলে যায় 257,885,161-1 সংখ্যাটির দখলে। বর্তমানে এটিই বৃহত্তম মৌলিক সংখ্যা। সংখ্যাটি এক কোটি চুয়াত্তর লক্ষ পঁচিশ হাজার এক সত্তরটি  অঙ্ক নিয়ে গঠিত। তবে সংখ্যাটি ‘বৃহত্তম মৌলিক সংখ্যা’ হওয়ার গৌরব কতদিন ধরে রাখতে পারে সেটাই এখন দেখার। এ যেন রেকর্ড গড়া আর রেকর্ড ভাঙার খেলা! ‘বৃহত্তম মৌলিক সংখ্যা’র তকমাটা থাকুক বা না থাকুক, বিপুল সংখ্যক অঙ্ক নিয়ে গঠিত মৌলিক সংখ্যাগুলির একটা নিজস্ব নাম বরাবরের জন্য থাকবে। কমপক্ষে কতগুলি অঙ্ক থাকলে কী নামকরণ করা হবে তা প্রথম ঠিক করেছিলেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও গণিত বিশারদ্‌ স্যামুয়েল ইয়েটস্‌ (Samuel Yates)। যেমন ……….

 

টাইটানিক প্রাইম (Titanic Prime):

1000 (এক হাজার) বা তার বেশি সংখ্যক অঙ্ক নিয়ে গঠিত মৌলিক সংখ্যাকে বলে টাইটানিক প্রাইম। প্রথম 30 টি টাইটানিক আকার হলঃ 10999+n যেখানে, n = 7,663, 2121, 2593, 3561……… ইত্যাদি। স্পষ্টত, n = 7 হলে আমরা ক্ষুদ্রতম টাইটানিক প্রাইমটি পাবো এবং সেটি হল 10999 + 7.

জাইগ্যান্টিক প্রাইম (Gigantic Prime):

10,000 (দশ হাজার) বা তার বেশি সংখ্যক অঙ্ক নিয়ে গঠিত মৌলিক সংখ্যাকে বলে জাইগ্যান্টিক প্রাইম। ক্ষুদ্রতম জাইগ্যান্টিক প্রাইমটি হলো 109999 + 33603; 2003 সালে এর মৌলিকত্ব প্রমাণ করেছিলেন জার্মান গণিতজ্ঞ জেন্স ফ্র্যাঙ্ক (Jens Franke)

মেগা প্রাইম (Mega Prime):

10,00,000 (দশ লক্ষ বা এক মিলিয়ন) বা তার বেশি সংখ্যক অঙ্ক নিয়ে গঠিত মৌলিক সংখ্যাকে বলে মেগা প্রাইম। ক্ষুদ্রতম মেগা প্রাইমটি হলো 10999999+593499;

এই মৌলিকটির সন্ধান পেয়েছিলেন পিটার কাইজার (Peter Kaiser), কেনেথ পিডারসেন (Kenneth Pederson), প্যাট্রিক ডি গিস্ট (Patrick De Geest)।

মৌলিক সম্বন্ধ (Prime Relationship)

মানুষের সঙ্গে মানুষের যেমন সম্বন্ধ হয়, তেমন একটি সংখ্যার সঙ্গে অপর একটি সংখ্যা নানাভাবে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। তবে সবথেকে আশ্চর্যের ও বিস্ময়কর সম্বন্ধ আছে বোধ হয় মৌলিক সংখ্যাদের মধ্যে আছে পিতা-পুত্রের সম্পর্ক। শুধু তাই নয়, একটু অনুসন্ধান করলে এদের মধ্যে দাদু-নাতি সম্পর্কও দেখতে পাওয়া যায়।

পিতৃ মৌল ও পুত্র মৌল (Father Prime & Child Prime):

একটি মৌলিক সংখ্যার অঙ্কগুলির বর্গের যোগফল যদি অপর একটি মৌলিক সংখ্যা হয়, তবে প্রথম মৌলটিকে পিতৃ মৌল (Father Prime) এবং উৎপন্ন মৌলটিকে পুত্র মৌল (Child Prime) বলে। যেমন, 23 সংখ্যাটি একটি মৌলিক সংখ্যা।

এর অঙ্কগুলির যোগফল 23  22 + 32   4 + 9  13, যা একটি মৌলিক সংখ্যা। অতএব, 23 হলো পিতৃ মৌল ও 13 হল পুত্র মৌল।

আবার দেখো, 13  12 + 32   1 + 9   10; যা একটি যৌগিক সংখ্যা। অর্থাৎ 13 কোনও সন্তানের জন্ম দিতে পারলো না। তাই একে পিতৃ মৌল বলা যাবে না।

এইরূপে দেখা যায় –

191   12 + 92 + 12   1 + 81 + 1   83   82 + 32   64 + 9   73;

 

(পিতা)                                 (পুত্র)                       (নাতি)

এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ পাঁচটি জেনারেশানের সন্ধান পাওয়া গেছে। একটি উদাহরণ হলো –

1499    12 + 42 + 92 + 92  179   12 + 72 + 92  131  12 + 32 + 12  11  12 + 12  2;

 

(প্রপিতামহ)               (পিতামহ)            (পিতা)            (পুত্র)    (নাতি)

এখানেই সম্বন্ধের শেষ নয়। মৌলিক সংখ্যাদের মধ্যে আছে ভাই-ভাই সম্বন্ধ। যেমন,

যমজ মৌল (Twin Prime):

যমজ সন্তানদের মধ্যে যেমন বয়সের পার্থক্য ন্যূনতম হয়, তেমনি দুটি মৌলিক সংখ্যাকে যমজ মৌল বলা হয় যখন তাদের অন্তরফল সবথেকে কম। অবশ্য এদের মৌল জোড়ও (Prime pair) বলা হয়।

বলা বাহুল্য, এই অন্তরফলের মান হবে দুই। ‘Twin Prime’ নামকরণ করেছিলেন জার্মান গণিতজ্ঞ পল্‌ গুসবব স্যামুয়েল স্ট্যাকেল (Paul Gustav Samuel Stackel)।(Photo4) সংখ্যার দুনিয়ায় এরূপ অসংখ্য যমজ মৌলের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথম দিকের কয়েকটি যমজ মৌলের উদাহরণ হলো – (3,5), (5,7), (11,13), (17,19), (29,31), (41,43), (59,61), (71,73), (101,103), (107,109), (137,139) ইত্যাদি। এখনও পর্যন্ত জানা বৃহত্তম যমজ মৌলটি হলো। 3756801695685.2666669+1; সংখ্যাটিতে অঙ্ক সংখ্যা দু লক্ষ সাতশটি। 1915 সালে নরওয়েবাসী গণিতজ্ঞ ভিগো ব্রুন (Viggo Brun) যমজ মৌলদের এক সুন্দর বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যমজ মৌলগুলির অন্যোনকের যোগফল সর্বদা অভিসারী।’

অর্থাৎ, (1/3+1/5) + (1/5+1/7) + (1/11+1/13) + —— <

 জ্ঞাতিভাই মৌল (Cousin Prime):

দুটি মৌলিক সংখ্যার অন্তরফল যত বাড়বে তাদের মধ্যে সম্পর্কও পাল্টে যাবে। দুটি মৌলিক সংখ্যার পার্থক্য 4 হলে, তাদের বলা হয় জ্ঞাতিভাই মৌল। এরূপ মৌলের মধ্যে প্রথম দিকের কয়েকটি জ্ঞাতিভাই মৌলের উদাহরণ হল –

(3,7), (7,11), (13,17), (19,23), (37,41), (43,47), (67,71), (79,83), (97,101), (103,107) ইত্যাদি।

7 হল একমাত্র মৌলিক সংখ্যা যে দুটি মৌলের সঙ্গে জ্ঞাতিভাই মৌলের সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছে।

সেক্সি মৌল (Sexy Prime)!

বাংলায় যাকে আমরা ‘ছয়’ বলি, ইংরেজিতে তাকে বলি ‘সিক্স’। তাকেই আবার ল্যাটিন ভাষায় বলা হয় ‘সেক্স’। কাজেই ইংরেজিতে ‘সেক্স’ শব্দটির মানে যাই হোক না কেন, ল্যাটিন ভাষায় ‘সেক্স’ মানে ছয় এবং সেখান থেকেই ‘সেক্সি প্রাইম (sexy prime)’ কথাটির উৎপত্তি।

দুই বা ততোধিক মৌলিক সংখ্যার সাধারণ অন্তর ছয় হলে, তাদের সেক্সি মৌল বলে। যেমন, (5,11) হল সেক্সি মৌল জোড় (sexy prime pair)। কারণ এদের পার্থক্য = 11 – 5 = 6; আরো কয়েকটি সেক্সি মৌল জোড়ের উদাহরণ হলো –

(7,13), (13,19), (17,23), (11,17), (31,37), (37,43), (41,47), (47,53) ইত্যাদি।

কেবল মৌল জোড় যে সেক্সি হবে তা নয়; মৌল ত্রয় (prime triplet), মৌল চতুষ্টয় (prime quadruplet), এমনকি মৌল পঞ্চক (prime quintuplet) ও সেক্সি হতে পারে।

কয়েকটি সেক্সি মৌল ত্রয়ের উদাহরণ হল –

(7,13,19), (17,23,29), (31,37,43), (47,53,59), (67,73,79) ইত্যাদি।

তেমনি কয়েকটি মৌল চতুষ্টয়ের উদাহরণ হল –

(5,11,17,23), (11,17,23,29), (41,47,53,59), (61,67,73,79)ইত্যাদি।

সংখ্যার দুনিয়ায় মৌল পঞ্চক আছে মাত্র একটি এবং সেটি হল – (5,11,17,23,29)

1849 সালে ফরাসী গণিতজ্ঞ আলফোঁসে ডি পলিগ্‌ন্যাক (Alphonse de Polignac) অনুমান করেছিলেন যে প্রতিটি স্বাভাবিক সংখ্যা K–র জন্য অসংখ্য মৌলজোড় (p,p‘) পাওয়া যায়, যেখানে p – p‘ = 2K  হয়।

K = 1 হলে   p – p‘ = 2; তখন (p,p‘) যমজ মৌলজোড়কে বোঝায়।

K = 2 হলে   p – p‘ = 4; তখন (p,p‘) জ্ঞাতিভাই মৌলজোড়কে বোঝায়।

K = 3 হলে   p – p‘ = 6;  তখন (p,p‘) সেক্সি মৌলজোড়কে বোঝায়।

is.gd/BlogMSW @ বিকাশ মন্ডল

comments

কোন কমেন্ট নেই

LEAVE A REPLY

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.