প্রয়োজন মানুষকে অনেক বদলে দেয়। না হলে কৃষক কোনদিন হ্যাকিং এর চিন্তা করবে? তাও আবার নিজের জমির তথ্য! হ্যাঁ, ব্যাপারটা সেরকমই।

কেননা পৃথিবীতে দিনকে দিন কৃষি জমি কমছে অথচ খাবার খাওয়ার মুখও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে! সুতরাং আসন্ন খাদ্য সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে অল্প জমিতে চাষ করতে হবে অধিক ফসল। না হলে বিশ্বজুড়েই দেখা দেবে খাদ্য সংকট। যার ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। ধনীরা টাকা দিয়ে না হয় খাবার কিনবে কিন্তু যাদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা নাই, তারা কী করবে? অথবা এমনও হতে পারে, টাকা থাকলেও খাদ্য মিলবে না।

ভেনেজুয়েলাতে এরকম খাদ্য সংকট চলেছে। তাদের দেশ তেল সমৃদ্ধ হওয়ার পরেও তাদের দেশে খাদ্য নিয়ে বিরাট বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বড় বড় খাবারের দোকানে চলেছে লুটপাট। সেনাবাহিনীর গুলিতে দিতে হয়েছে প্রাণ। এমনকি মোটামুটি সচ্ছ্বল পরিবারের লোকজনকেও খাবার খেতে হয়েছে রোটেশন (এক জনের পর একজন) করে। মা দুপুরে খেলে, মেয়ে খেয়েছে রাতে। এমন অবস্থা ছড়িয়ে পড়তে পারে পৃথিবীর যেকোনো দেশে।

যদিও ভেনেজুয়েলাতে খাবার সংকটের কারণ ছিল ভিন্ন। তাদের সংকটের প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক। কারণ যাই হোক, খাদ্য সংকট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকট। এটাকে মোকাবেলা করার জন্যে পৃথিবীতে চলছে বিস্তর গবেষণা। আমেরিকার গবেষণা অনুসারে ২০৩০ সালেই পৃথিবীতে খাবারের মুখ বাড়বে ১.২ বিলিয়ন! তাই এর জন্যে প্রয়োজন ব্যাপক প্রস্তুতি।

কৃষি নিয়ে গবেষণা করে এমন এক আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের নাম হচ্ছে, ক্লাইমেট কর্পোরেশন। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে ড্রোন এবং অন্যান্য মাধ্যমে তাদের কাভারেজ এরিয়ার কৃষি জমির তথ্য সংগ্রহ করা। এবং এই তথ্য একটি অ্যাপসের সাহায্যে স্লেট আকৃতির ট্যাবে তুলে ধরা। অনেকটা স্যাটেলাইট ভিউয়ের মতো একজন কৃষক তার কৃষি জমির হালনাগাদ তথ্য পেয়ে যাবেন। এই ট্যাবে কৃষকের জমির অংশ লাল এবং সবুজ রঙে প্রকাশ করা হয়। যদি জমির রঙ সবুজ হয় তবে বুঝে নিতে হবে সব ঠিকঠাক আছে। আর যদি লাল রঙ দেখায় তবে বুঝতে হবে সবকিছু পরিকল্পনা মতো হচ্ছে না। যেমন আপনার জমিতে ক্ষতিকারক ভাইরাসের আক্রমন দেখা দিয়েছে। ফলে তা প্রকট আকার ধারণ করার আগেই নেয়া যাবে ব্যবস্থা।

অর্থাৎ একসময় কৃষক ফসল পেলেই বুঝতে পারত তার কৃষি পদ্ধতি সঠিক ছিল না ভুল ছিল। কিন্তু এখন ফসল আসার আগেই কোনো ভুল হলে তা শুধরে নেয়া যাবে। অর্থাৎ জমির তথ্য ‘হ্যাক’ করে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যাবে।

ক্লাইমেট কর্পোরেশন তাদের কার্যক্রম আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ রাখছে না। বরং অল্প কিছুদিনের ভেতরই তা পরীক্ষামূলক ভাবে ব্রাজিলে উদ্বোধন করা হবে। এবং কানাডাতেও এর কার্যক্রম পাকাপাকিভাবে আসন গাড়তে যাচ্ছে। ক্লাইমেট কর্পোরেশনের সিইও মাইক স্টার্ন বলেন, ‘আমরা কৃষি জমির তথ্য এমন সহজ ভাবে পাব, যেভাবে যেকোনো তথ্য আমরা আমাদের মোবাইল বা ট্যাবে পেয়ে থাকি।’

এখানে তথ্যের অনেক ভাণ্ডার থাকবে। গত ২৪ ঘণ্টা আপনার কৃষি জমিতে কেমন পরিবর্তন এসেছে কিংবা এই জমির অতীত এবং বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যতে কেমন আচরণ করতে পারে, তার উপদেশও থাকবে। এর ‘ফিল্ড হেলথ অ্যাডভাইজার’ ফিচারে ড্রোন এবং স্যাটেলাইটের দ্বারা তোলা ছবি দিয়ে জমির স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানানো হবে। এই ছবিতে লাল দাগের জমিগুলোকে দেখানো হবে অস্বাস্থ্যকর জমি হিসেবে।

মাইক স্টার্ন আরে বলেন, যেসব কৃষকের অনেকগুলো কৃষি জমি রয়েছে, তার পক্ষে সব জমির সমান খবর রাখা সম্ভব না। তাই এই অ্যাপসের মাধ্যমে সে তার সকল জমির অবস্থা দেখে নিতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে। এই কোম্পানি গঠন করেন গুগলের সাবেক দুই চাকরিজীবী। এটি মূলত এগ্রোকেমিক্যাল কোম্পানি।

যেহেতু তারা আমেরিকার বাইরে ব্রাজিল এবং কানাডাতেও তাদের কার্যক্রম বিস্তার করছে, হয়তো একসময় আমাদের দেশেও আমরা এর সুবিধা নিতে পারবো। তাতে করে আমাদের ফসলের ফলন অনেক বৃদ্ধি পাবে। কেননা কোনো কোনো মৌসুমে দেখা যায় ভাইরাসের কারণে আমের মুকুল অকালেই ঝরে যায়, ফলে সেবছর আমের ফলন কমে যায়। কিংবা ধান ক্ষেতে ভাইরাসের কারণে চিটা ধান ঠেকানো যাবে। এক কথায় কৃষির যেকোনো সমস্যা আগে থেকে আঁচ করা যাবে। আর সেটা করতে পারলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেয়া যাবে। তাই আমরাও চাই আমাদের কৃষকরাও হ্যাকার বনে যান এবং আমাদের দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদন উদ্ধৃত করে তা রপ্তানির পর্যায়ে নিয়ে যান।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.