মানুষ একসময় বসবাস করত গুহায়। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গিয়ে বাড়ি নয়, বেছে নিত আরেকটি গুহা। কেননা, সেটাই ছিল নিরাপদ ঠিকানা। স্ত্রী, ছেলেমেয়েকে নিয়ে গুহাতেই ছিল তাদের সংসারজীবন। সময়টা ছিল ঐতিহাসিককালে, উহু ঠিক হলো না, প্রাগৈতিহাসিককালে। অন্য কথায়, ইতিহাস লেখাই শুরু হয়নি তখনো।

কিন্তু একুশ শতকে বিজ্ঞানের চরম উন্নতির যুগে হঠাৎ যদি শোনা যায়, গুহাবাসী মানব আবার ফিরে এসেছে, তাহলে চোখ কপালে ওঠারই কথা। সেই অরণ্য নেই, পতিত জমিও নেই, দখলবাজ মানুষ দখল করার বাকি রাখেনি কোনো কিছু।

আর কিনা আমি বলছি, একুশ শতকে গুহামানব। বিশ্বাস করুন, আর নাই করুন- গুহাবাসী এখনো আছে, অন্তত একজন হলেও। তার নাম পেদ্রো লুকা, বয়স ৭৯। অরণ্য না থাকলেও শিকার করে পেট চালান। একটা পেট তো, তাই শিকারের অভাব হয় না। পিপাসা লাগলে ক্রিকের (ঝরনা থেকে সৃষ্ট ছোট পানির ধারা) পানি খান। টিউবওয়েল বা লাইনের পানি নেই। বিদ্যুতের তো বালাই নেই। এভাবেই কাটিয়ে দিলেন ৪০ বছর, আর্জেন্টিনার উত্তরের টুকুম্যান প্রদেশের একটি পাহাড়ের গুহায়।

যখনই ক্ষুধা লাগে তখনই হাতে তুলে নেন তার প্রিয় রাইফেল। তারপর বেরিয়ে পড়েন শিকারের খোঁজে।

গুহাবাসী হলেও তিনিও মানুষ। কোনো না কোনো প্রয়োজন তারও হয়। তখনই কেবল নেমে আসেন তিনি পাহাড় থেকে। তার নিকটতম বসতি স্যান পেদ্রো ডি কোলালাও। তার খাওয়ার পানির প্রধান উৎস একটি ক্রিকের পানি।

‘একেবারে টলটলে পানি, খেতেও খুব ভালো লাগে,’ বললেন তিনি। গুহায় তার সঙ্গে থাকে ১১টি মোরগ-মুরগি আর দুটি ছাগল। সারা দিন পাহাড়ের এখানে সেখানে আপন মনে ঘুরে বেড়ায়। রাত হলে আশ্রয়ের সন্ধানে আবার ফেরে গুহায়। পুমা ও অন্যান্য শিকারি প্রাণীর হামলার ভয় তো তাদেরও আছে!

ভোরে মোরগ ডাকার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন তিনি। এরপর আগুন জ্বালান। তার তাপে পুরো গুহায় উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় তার অনুভূতি হয় খুবই আরামদায়ক, ‘আগুন যেন জাদুর মতো। মনও ভরে যায় উষ্ণতায়।’

এরই মধ্যে স্যান পেদ্রো ডি কোলালাওয়ে একজন ‘লিজেন্ডে’ পরিণত হয়েছেন লুকা। শহরবাসীরা তাকে বিভিন্ন ধরনের খাবার দিয়ে থাকে। এ ছাড়া অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যও দেয়। সরকারের কাছ থেকে বয়স্ক ভাতা পান তিনি প্রায় ২০০ ডলার, তা সংগ্রহ করে থাকেন শহরের পোস্ট অফিস থেকে। এই অর্থ দিয়ে মোমবাতি, ইস্ট, ভুট্টা কেনেন।

তার গুহায় শৌখিন কোনো কিছুই নেই। তবে ব্যাটারিচালিত ছোট্ট একটি রেডিও আছে। কিন্তু তা বাজানোর সময় পান না বললেই চলে। আর বাজলেও ঘ্যার ঘ্যার করে। পাহারের ওপর শব্দতরঙ্গ খুবই দুর্বল বলে।

প্রতিদিন তাকে তিন ঘণ্টা হাঁটতে হয়। গুহায় পৌঁছাতে উঠতে হয় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। তার ত্বক সামান্য কুঁচকে গেছে। দাঁতও পড়ে গেছে বেশ কয়েকটি। কিন্তু দেখতে তাকে ৮০ বছরের নয়, অনেক কম বয়সের মানুষ মনে হয়।

‘নিঃসঙ্গ জীবন আমার খুব ভালো লাগে। ভালো লাগে বন্য জীবনের স্বাদ নিতেও। আসলে ছেলেবেলা থেকেই এ রকমই একটি জীবন চেয়েছিলাম,’ নিজের চাওয়া-পাওয়ার কথা বললেন পেদ্রো। তিনি বেড়ে ওঠেন দাদার কাছে। বাড়ি ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন ১৪ বছর বয়সে। প্রথমে যান উত্তর আর্জেন্টিনা, পরে কয়লা পরিবহনের কাজ নিয়ে যান বলিভিয়ায়।

পেদ্রো লুকা তার ছেলেবেলার এলাকা ও গুহায় ফিরে নিঃসঙ্গ জীবন শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার কথা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে তার কাছে মাঝেমধ্যে আসেন পর্যটকরা। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও আসে, তখন তার খুব ভালো লাগে।

‘আমি কখনো আমাকে জিজ্ঞেস করে দেখিনি যে, এই জায়গা কেন আমি বেছে নিলাম। কাছাকাছি আরেকটি গুহা আছে। কিন্তু এটিকেই আমার বেশি ভালো লাগে,’ বলেন তিনি। এরপর আরো বললেন নিজের ইচ্ছার কথা, ‘কখনো কখানো আমার মনে হয়, ঘুরেফিরে পৃথিবী দেখতে পেলে খুব ভালো লাগত।’

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.