যতদিন যাচ্ছে, আধুনিক জীবনযাপন ততবেশি প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তিগত সুবিধা যেখানে বেশি, মানুষের আগ্রহ সেখানে বেশি। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পেতে সকলেই আগ্রহী।

 

ব্যক্তিগত কিংবা কাজের প্রয়োজনে দেশের বাইরে অনেকেই ভ্রমণ করে থাকেন। সুতরাং আপনি যদি একটি অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে চান, তাহলে আধুনিক প্রযুক্তির হোটেল দেবে সেই অভিজ্ঞতা।

 

ভাবুন তো, ব্যাপারটা কতটা দারুন হবে, যদি দেখেন যদি ঢোকার পরপরই আপনাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে কোনো রোবট! কিংবা হোটেলের রুমের তাপমাত্রা আপনার দেহের তাপমাত্রা পরিমাপ করে সে অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে খুবই আরামদায়ক পরিবেশ বজায় রাখছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন নিউজপোর্টাল বিজনেস ইনসাইডার সম্প্রতি উচ্চ প্রযুক্তির ১৪টি হোটেল নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। পরিচিত হয়ে নিন আধুনিক প্রযুক্তির এই হোটেলগুলোর সঙ্গে।

ক্যালিফোর্নিয়া : অ্যালোফ্ট কুপারটিন

অ্যালোফ্ট কুপারটিনো হোটেলে সেবাকর্মীর দায়িত্বে রয়েছে বিশেষ রোবট। যেমন আপনি পুলে গোছল করতে গেলেন, সঙ্গে টাওয়েল নিয়ে উপস্থিত থাকবে রোবটটি। Botlr নামক বুদ্ধিমান এই রোবটটি রুমে নাস্তা নিয়ে হাজির হবে। এক্ষেত্রে রোবটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে পারে, লিফটে করে নির্দিষ্ট ফ্লোরে আপনার রুমের সামনে হাজির হয়ে রুমের ফোন নম্বরে কল করে জানাবে। এছাড়া এই হোটেলের রুমগুলো বেশ মনোরম এবং রুমে রয়েছে অ্যাপল টিভি। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি ১০ হাজার টাকা (১৩০ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

নিউ ইয়র্ক : ইয়োটেল

ইয়োটেল হোটেলে আপনার লাগেজ সুরক্ষিতভাবে বিশেষ ড্রয়ারে রেখে দেবে ইয়োবট নামক রোবট। এবং লাগেজের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে এই রোবট। হোটেল রুমে প্রবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির কিয়স্ক ব্যবস্থা। রুমের বিছানা মোটোরাইজড, যা ভাঁজ করে অন্যকিছু হিসেবে ব্যবহার করা যায়। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি প্রায় সাড়ে ১০ হাজার টাকা (১৩৫ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

সেয়াটেল : হোটেল ১০০০

এই বিলাসবহুল হোটেলে রয়েছে ভার্চুয়াল গলফ কোর্স, যেখানে আপনি বিশ্বের প্রায় ৫০টি সেরা গলফ কোর্সের যেকোনোটি খেলতে পারবেন। হোটেলটিতে ২টি গলফ স্টেশন রয়েছে। এখানে টার্ফে দাড়িয়ে ভার্চুয়াল স্ক্রিনের গলফ কোর্সে দিকে বল হিট করা যাবে। এতে ইনফ্রারেড ট্রাকিং সিস্টেম এবং ৬৮০টির বেশ সেন্সর রয়েছে, যা বলের বেগ, ঘূর্ণন এবং বলের পথ মিলিয়ে গলফ খেলার বাস্তব অনুভূতি দেবে। এছাড়া হোটেলের রুমগুলো সেন্সরযুক্ত, যা শরীরের তাপমাত্রা বুঝে সে অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। স্মার্ট ক্লাইমেট কন্ট্রোল সেটিংস সুবিধার দরুন, আপনার শরীরের তাপমাত্রা অনুযায়ী আরামদায়ক তাপমাত্রা রুমে বজায় থাকে। রয়েছে স্মার্ট মিনি বার, যেটি ফ্রন্ট ডেস্কে যোগাযোগ করবে বারের স্টক ফুরানোর আগেই। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা (২৫০ ডলার) থেকে শুরু।

 

আমস্টারডাম: সিটিহাব

সিটিহাব দিচ্ছে স্বল্প খরচে ঘুমোবার আধুনিক ছোট্ট রুম (পোড), যা মূলত হোস্টেল এর বিকল্প হতে পারে। হোটেলটিতে এরকম প্রায় ৫০টি পোড রয়েছে, যা ডাবল বেড হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। এসব রুমে ওয়াই-ফাই, অডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস এবং অ্যাপ নিয়ন্ত্রত মুড লাইটিং সুবিধা রয়েছে, স্মার্টফোনের অ্যাপের মাধ্যমে মুড অনুযায়ী রুমের আলো পরিবর্তন করা যায়। এছাড়া আপনি যাতে আবদ্ধ অনুভব না করেন, সেজন্য পোডে জানালা সুবিধা রয়েছে, গোপনীয়তার সময় বন্ধ রাখতে পারেন। রুম লক-আনলক করা যাবে হাতে থাকা সিটিহাবের ব্রেসলেটের মাধ্যমে। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি সাধারণত ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে, তবে ভ্রমণ মৌসুমে তা আরো বেড়ে যায়।

 

 

সিঙ্গাপুর: সেনটোসা উপসাগরবর্তী ডব্লিউ সিঙ্গাপুর

সেনটোসা উপসাগরবর্তী এই হোটেলে রয়েছে আউটডোর সুইমিং পুল এবং পুলের নীচে স্পিকার সিস্টেম সুবিধা, ফলে সাঁতার কাটতে কাটতে গান উপভোগ করা যাবে। পুলসংলগ্ন অভিজাত রুমে রয়েছে ডিজে বুথ, তথ্য নিরাপত্তায় লোনার আইপ্যাড প্রোগ্রাম। অভিজাত রুমের ভাড়া রাত প্রতি প্রায় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা (৮৬০০ ডলার)। এছাড়া হোটেলের সর্বত্র রয়েছে মুগ্ধকর এলইডি লাইটিং। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি প্রায় ২২ হাজার টাকা (২৭৩ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

জাপান: হে-না হোটেল

জাপানের সাসেবো শহরে অবস্থিত হে-না হোটেলটি ইংরেজিতে অয়্যারর্ড নামে পরিচিত। যার অর্থ আশ্চর্য বা অদ্ভূত হোটেল। এই হোটেলের প্রায় সব সেবা রোবট নির্ভর। হোটেলে চেক-ইনের ক্ষেত্রে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে ইংরেজি ভাষার ডাইনোসর রোবট কিংবা জাপানি ভাষার মানবসাদৃশ্য রোবট। হোটেল থেকে রুম পর্যন্ত লাগেজ পরিবহনও করবে বিশেষ রোবট। রুমের মধ্যে থাকা পুতুল রোবট জানাবে বিভিন্ন ইভেন্টের খবরসহ অন্যান্য তথ্য। একমাত্র গৃহস্থালি কাজে মানুষের দ্বারা সেবা দেওয়া হচ্ছে, বাদবাকি প্রায় সব সেবাই রোবট নির্ভর। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি প্রায় ২৮ হাজার টাকা (৩৫০ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

পোল্যান্ড: ব্লো আপ হল ৫০৫০

হোটেলটির অভ্যর্থনা কোনো ম্যানুয়াল সিস্টেম নেই। স্মার্টফোনে পাঠানো হোটেল কর্তৃপক্ষের ডিজিটাল চাবি দিয়ে রুমে প্রবেশ এবং রুম লক-আনলক করা যায়। হোটেলটি ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ ওয়ার্ক অব আর্ট’-এর জন্য বেশ পরিচিত, কারণ হোটেল জুড়ে অসংখ্য ডিজিটাল আর্ট রয়েছে। বিশেষ করে হোটেলের লবিতে বিরাট ডিজিটাল শৈলী, আপনাকে অভিনব অভিজ্ঞতা দেবে। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি ৮ হাজার টাকা (১০৩ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

কানেকটিকাট : জে হাউজ গ্রিনউইচ

বিলাসিতাময় এই হোটেলের জিনিসপত্র সর্বাধুনিক ফ্যাশনের। বিশেষ করে এই হোটেলের টয়লেট বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও উচ্চপ্রযুক্তি নির্ভর। টেটো নিওরেস্ট নামক এসব টয়লেট বিডেট প্রযুক্তি সম্পন্ন ফলে কাছাকাছি গেলেই কমোডের ঢাকনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়, বসার পর আরামদায়ক বাতাস দেয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিস্কার হয়, কমোডে গান বাজে। হোটেল রুমে রয়েছে ২টি ৫৫ ইঞ্চি স্ক্রিনের মিরর টেলিভিশন, একটি বেডরুমে অন্যটি বাথরুমে। এছাড়া আইপ্যাডের মাধ্যমে রুমের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, আলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং রুম সার্ভিসের অর্ডার দেওয়া যায়। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি ১৫ হাজার টাকা (১৯৩ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

নিউ ইয়র্ক : সিটিজেন এম

এই হোটেলে ট্যাবের মাধ্যমে টিভি নিয়ন্ত্রণ, জানালার পর্দা, রুমের তাপমাত্রা ও আলো, সকালের অ্যালার্ম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সিটিজেন এম হোটেলটিতে এছাড়াও সেল্ফ চেক-ইন ও চেক-আউট সুবিধা রয়েছে। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি ১২ হাজার টাকা (১৬০ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

লন্ডন: কোভেন্ট গার্ডেন হোটেল

এই হোটেলের রুম অ্যাপ নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং অ্যাপ ডাউনলোড করে স্মার্টফোনের মাধ্যমেই রুমের তাপমাত্রা, আলো, মিউজিক নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমনি রুমের বাইরে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ চিহ্নও ডিজিটালি ঝুলিয়ে দেওয়া যায় স্মার্টফোন থেকেই। রুমের বেডের সঙ্গেও এসব সুবিধা কন্ট্রোল প্যানেলের মাধ্যমে রাখা হয়েছে। ৪০ ইঞ্চি স্মার্ট টিভির সুবিধা রয়েছে রুমে। এছাড়া অ্যাপ ব্যবহার করে স্মার্টফোনে দেখা যাবে ভাচুর্য়াল রিয়েলিটি সুবিধায় হোটেলের ফ্লোরের নিকটস্থ রেস্তোঁরা ও বারের তথ্য। রুমের গড় ভাড়া প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকা (৮২ ডলার)।

 

 

লাস ভেগাস: আরিয়া রিসোর্ট এবং ক্যাসিনো

আরিয়া হোটেলের রুমগুলো স্মার্ট প্রযুক্তির। অর্থাৎ আপনি রুমে প্রবেশ করলে রুম তা বুঝতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানালার পর্দা খুলে যাওয়া, মিউজিক চালু হওয়া কিংবা টিভি চালু হওয়া, শরীরের তাপমাত্রা অনুযায়ী আরামদায়ক তাপমাত্রা সেট হবে। রুমে থাকা টাচস্ক্রিন ডিভাইসটির মাধ্যমে রুম কন্ট্রোলের এসব সুবিধা পাওয়া যায়। এবং দরজার বাইরে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ চিহ্নটি চালু করা যায় ডিভাইস থেকে। রুম খোলার ক্ষেত্রে চাবির বদলে স্মার্টফোন-ই চাবি হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ক্যাসিনোর ব্ল্যাক জ্যাক টেবিলে আপনি আগ্রহী হয়ে থাকে, তা শুরু হওয়া মাত্র পুশ নোটিফিকেশনে জানাবে। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি ১৩ হাজার টাকা (১৬৭ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

জার্মানি: প্রিজিওটেল

জার্মানির হামবুর্গ শহরে অবস্থিত প্রিজিওটেল হোটেলের রুম রয়েছে মিউজিক ল্যাম্প, যা ব্লুটুথের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া এই ল্যাম্পের সাহায্য কল করা এবং ফোন চার্জ দেওয়া যায়। প্রতিটি রুমে রয়েছে ৩২ ইঞ্চি ফ্ল্যাট টিভি। হোটেলে আরো রয়েছে ডিজিটাল নিউজপেপার কিয়স্ক। প্রতিটি রুমের বাথরুমের মেঝে আরামদায়ক উঞ্চ সুবিধার। রুমের ভাড়া রাতপ্রতি সাড়ে ৫ হাজার টাকা ( ৭১ ডলার) থেকে শুরু।

 

 

বার্লিন : এনএইচ হোটেল

ব্যবসায়িক কাজে জার্মানির বার্লিন গিয়ে থাকলে আপনার জন্য উপযুক্ত হতে পারে এনএইচ হোটেল। এতে হলোগ্রাফিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, ফলে ব্যবসায়িক মিটিংয়ে নিজেকে বা অন্যকাউকে থ্রিডি ইমেজে উপস্থাপন করা যায়। প্রজেক্টের থ্রিডি প্রজেকশন তৈরি করা যায়। বার্লিন ছাড়াও মিলান এবং বার্সেলোনার হোটেলও হলোগ্রাফিক প্রযুক্তির সেবা সম্পন্ন। হোটেলের স্মার্ট রুম প্রযুক্তিতে ২৫০ জন কনফারেন্স কলে অংশগ্রহণ করতে পারে।

 

 

ভার্জিনিয়া: হিলটন হোটেল

ভার্জিনিয়ার ম্যাকলিন এলাকায় অবস্থিত হিলটন হোটেলে অভ্যর্থনায় রয়েছে রোবট কর্মী। যা আইবিএম ওয়াটসন সিস্টেমের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা সম্পন্ন। হোটেল রুমে প্রবেশ করা যায় স্মার্টফোন ব্যবহার করে। প্রয়োজনীয় জিনিসের অর্ডারে রয়েছে এসএমএসভিত্তিক সার্ভিস কিপসু। এছাড়া ইলেকট্রনিক গাড়ি চার্জের জন্য হোটেলটিতে কয়েকটি স্টেশন রয়েছে। হোটেলের কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিরীক্ষণ জন্য রয়েছে বিশালাকার ডিসপ্লের মনিটর।

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.