সফটওয়্যার জগতে আরেকটি হইচই ফেলে দেয়া সফটওয়্যারের আবির্ভাব ঘটছে। ঘটছে বলার কারণ হচ্ছে, সফটওয়্যারটি এখনই জনসাধারণের ব্যবহারের জন্যে উম্মুক্ত করা হচ্ছে না।

অ্যাডোবি যখন ছবি এডিট করার সফটওয়্যার অ্যাডোবি ফটোশপ নিয়ে এল, তখনো এমনই শোরগোল পড়েছিল। এবং সত্যি বলতে কি, যে কারণে শোরগোল হয়েছিল বা যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবতা কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর ছিল। এবারও তাই। সবাই এই সফটওয়্যার নিয়ে ভীষণ আতঙ্কিত।

কেউ কেউ বলছেন, এতে করে প্রকৃত সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেউবা বলছেন, বিচার ব্যবস্থা পরে যাবে দ্বিধায়। আসলে কি আছে অ্যাডোবির নতুন এই সফটওয়্যারে?

‘ফটোশপ ফর ভয়েস’ নামক নতুন সফটওয়্যারে যা আছে, সত্যি বলতে কি তা নীতিগতভাবে সমর্থন যোগ্য না। মানে আপনি একটি বাক্য বলবেন, সে বাক্যকে খুব কম সময়ের ভেতর এমনভাবে এডিট করা সম্ভব যা শুনে আপনি নিজেও ভড়কে যাবেন। আপনার কথার সঙ্গে যোগ করা যাবে অন্য বাক্য এবং বিয়োগ করা যাবে আপনার আসল কিছু শব্দ!

ফলে এডিটেড বাক্য শুনে কারো বোঝার উপায় থাকবে না, আসলেই সংশ্লিষ্ট কথা আপনি নিজেই বলেছেন কি না? আর এটা করা সম্ভব, টাইপ করেই! অর্থাৎ আপনার কথা যখন রেকর্ড হতে থাকবে, তখনই তার সঙ্গে আপনি টাইপ করে কিছু শব্দ জুড়ে দিতে পারবেন। এমনকি তখনই কিছু শব্দ বাদও দিতে পারবেন।

আর এই জায়গাটা নিয়েই সকলের শঙ্কা। কারণ, এতে করে যেকোনো কিছু সম্ভব। কেউ বলেনি এমন কিছু বলানো যেমন সম্ভব। আবার যা বলেছেন, সেটাকেও অস্বীকার করা সম্ভব হবে। কেননা তখন এই সফটওয়্যারের সুযোগের আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রকৃত বলা কথাকেও কেউ কেউ সুযোগ বুঝে অস্বীকার করতে পারেন। এর ফলে বস্তুনিষ্ঠতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যেটা ইতিমধ্যেই ছবি সম্পাদনার সফটওয়্যার অ্যাডোবি ফটোশপের দ্বারাই হচ্ছে।

রাইজিংবিডি নিজেই এমন এক ঘটনার সত্য উদ্ধারকারী। সন্ত্রাসীর হামলায় আহত খাদিজার ছবিকে দুর্বৃত্ত তার নিজের ছবির সঙ্গে এই ফটোশপের কারসাজিতেই জুড়ে দিয়ে ফাঁদতে চেয়েছিলেন মিথ্যা এক গল্প। যা ফাঁস করে দেয় রাইজিংবিডি। এ নিয়ে বিস্তারিত খবরও ছাপা হয়েছিল রাইজিংবিডিতে। আর অ্যাডোবির ভয়েস এডিটিং যদি সাধারণ মানুষের হাতে চলে আসে, তখন একে শনাক্ত করা খুবই দুরুহ হয়ে পড়বে।

কেননা ছবি না হয় একটির সঙ্গে আরেকটির তুলনা করা যায়। কিন্তু কণ্ঠস্বর? হ্যাঁ, সেজন্যে কিছু নিরাপত্তামূলক বিষয় থাকবে কিন্তু সেগুলো তো আর সুলভ হবে না। এবং অনেকের ধারণার ভেতরই থাকবেনা।

তাই কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েই? আসলেই কি এর দরকার ছিল? এমনিতেই ডিজিটাল এই যুগে মানুষ নানাভাবে প্রযুক্তির দ্বারা হেনস্তা হচ্ছে। এর ভেতর ভয়েস এডিটিং যেন, আগুনে ঘি’র মতোই কাজ করবে।

গত বৃহস্পতিবার সান ডিয়েগোতে অ্যাডোবি এর ডেমো প্রদর্শন করে। সেখানে এক ব্যক্তির কথা প্রথমে রেকর্ড করা হয়। যিনি বলেন, ‘এবং আমি আমার কুকুর এবং আমার বউকে চুমু খাই’। যা এডিট করে বানানো হয়, ‘এবং আমি জর্ডানকে তিনবার চুমু খেয়েছি!’ যা করতে সময় লাগে কিছু সেকেন্ড মাত্র! একজন একটি স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে টাইপ করতে থাকেন, যতক্ষণ না ব্যক্তিটির কথা রেকর্ড হচ্ছে।

অ্যাডোবির মুখপাত্র জিয়ু জিন বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই ছবি সম্পাদনায় বিবর্তন এনেছি। এখন সময় কণ্ঠস্বর সম্পাদনার। আসলে ইনি কি বিবর্তনের কথা বলেছেন তিনি নিজেই জানেন। কেননা এসব সফটওয়্যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপব্যবহার হয়েছে। যদিও এর কিছু সুব্যবহারও আছে। তবে এর অপব্যবহারই বেশি হয়েছে।

আমাদের মতো রক্ষণশীল এবং প্রযুক্তি অজনপ্রিয় দেশগুলোতে এটি বিশাল ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। সামাজিক সম্পর্কে ডেকে আনতে পারে ভাঙ্গন। আবার এর একটি চমৎকার ব্যবহার হয়তো করা যেতে পারে। আর সেটা হলো, প্রয়াত কোনো কন্ঠশিল্পীর নতুন গান সৃষ্টি করা যেতে পারে। জানিনা এটাও কতটা নীতিগতভাবে সমর্থনযোগ্য অথবা আদৌ সে শিল্পীর পরিজনেরা এমন অনুমতি দেবেন কিনা? তবে এই সামান্য কিছু দিক ছাড়া এই সফটওয়্যার আমাদের খুব বেশিকিছু দিতে পারবে বলে মনে হয়না। তাই যৌক্তিক ভাবেই এর বিরোধীতা করছে টেক বিশেষজ্ঞরা। তাই অ্যাডোবি এখনই এর উম্মুক্তের তারিখ ঘোষণা করেনি।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.