ঘুম আসে না। ক্লান্ত শয়ন, রক্ত নয়ন, তবু ঘুম আসে না।রাত নেমেছে, ঘুম আসে না।রাত নেমেছে, ঘুম আসে না  অভিমানী মন মানে না, ঘুম আসে না।এ পাশ–ও পাশ রাত কেটে যায়, ক্লান্ত প্রদীপ তা-ও নিভে যায়, ঘুম আসে না।আবোলতাবোল ভাবনাগুলোর ঝড় বয়ে যায়, নিঃস্ব ঝিঝি-র তাল কেটে যায়, ঘুম আসে না।একাই শুধু জেগে থাকি, ঘুম আসে না।’

কবি ‘সবুজ হক’-এর লেখা এই কবিতার ভাবনাগুলোর সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। ঘুম আমাদের বড়ই ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। একটা রাত তার সঙ্গে না কাটাতে পারলেই, আমাদের হা-হুতাশ। আবার টমাস আলভা এডিসনের মতো আবিষ্কারক বা, প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মতে, ঘুম একটি অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় অভ্যেস!

কিন্তু সত্যিই কি তাই?

হিসেব করে দেখা গেছে আমাদের জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় আমরা ঘুমিয়েই কাটাই! ‘ঘুম’ বিষয়টাকে যে তলিয়ে দেখা ভাল, তা বুঝতে কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা অজস্র কাজ করেছেন ও করে চলেছেন। আর তার ফলে, আমরা এখন একটু একটু করে জানতে ও বুঝতে পারছি, ঘুম কেন আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। জানতে পারছি, যখন আমরা ঘুমিয়ে থাকি, আমাদের মস্তিষ্ক তখন কী করে। ঘুম না আসার কারণটাই বা কী? ঘুমের সময় আপাতদৃষ্টিতে কাউকে অজ্ঞান বলে মনে হলেও, তাঁর মস্তিষ্কের ইন্দ্রিয়-অনুভূতির ‘জানলা’টি যে বেশ খানিকটা খোলা থাকে, তা আমরা এই সব কাজ থেকে জানতে পেরেছি।

imageতা হলে, ‘ঘুম’-এর সঠিক সংজ্ঞাটি কী?

বিজ্ঞানীদের মতে, ‘ঘুম’ হল একটি পর্যাবৃত্ত (পিরিয়ডিক)। তা একেবারেই প্রাকৃতিক। আর তা একেবারেই সাময়িক ভাবে হারিয়ে যাওয়া চেতনার ক্ষণ। পৃথিবীর সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই ঘুম একটি জরুরি প্রক্রিয়া। যা কি না মানুষের ক্ষেত্রে সঠিক শ্বাসক্রিয়া, রক্ত সঞ্চালন, শারীরিক বৃদ্ধি ও সংক্রমণ রোধ করতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, এই সময় আমাদের শরীরের পাঁচ শতাংশ বেশি রক্ত মস্তিষ্কের দিকে সঞ্চালিত হয়। যখন আমরা ঘুমোই, তখন আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন ‘কেন্দ্র’ এক টানা কাজ করে। নিদ্রা আর জাগরণের প্রক্রিয়াটি সঠিক ভাবে চালু রাখার জন্য। প্রতি দিন ২৪ ঘণ্টায় আমরা ১৬ ঘণ্টা জেগে কাটাই আর ৮ ঘণ্টা থাকি ঘুমিয়ে। আর তার জন্য যে ‘কেন্দ্র’টির ভুমিকা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সেটি হল- আমাদের মস্তিষ্কের নীচের দিকে থাকা ছোট্ট বাদামের মতো একটি অংশ। যার নাম-‘হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus)’। আমরা জেগে থাকব নাকি ঘুমিয়ে পড়ব, তার অনেকটাই নির্ভর করে ‘হাইপোথ্যালামাস’ আর ‘ব্রেন স্টেম’ নামে দু’টি বিশেষ  অংশের ওপরে। মস্তিষ্কের যে দু’টি অংশের কথা বললাম, তার কিছু নিউরন বা স্নায়ুকোষই এই কাজটার জন্য দায়ী। এদের দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে যে স্নায়ুকোষগুলি উত্তেজিত থাকলে আমরা এক টানা ১৬ ঘণ্টা জেগে থাকতে পারি, তারাই তখন ক্রমাগত ‘ঘুম আনার জন্য দায়ী’ স্নায়ুকোষগুলিকে দাবিয়ে রাখে।

নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মস্তিষ্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’ আর ‘ব্রেন স্টেম’-এর বিশেষ কিছু স্নায়ুকোষ উত্তেজনার সঙ্কেত (সিগন্যাল) মস্তিষ্কের ‘হায়ার সেন্টার’ বা ‘কর্টেক্সে’ (মস্তিষ্কের ওপরের অংশটিকে) পাঠাতে থাকে যতক্ষণ আমরা জেগে থাকি বিশেষ ‘রাসায়নিক সংবাদদাতা’ বা ‘কেমিক্যাল নিউরো-ট্রান্সমিটার’-এর মাধ্যমে। মস্তিষ্ককে উত্তেজিত রাখতে গিয়ে ‘হিস্টামিন’ নামে এক ধরনের নিউরো-ট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে ‘হাইপোথ্যালামাস’-এর ‘টিউবারো-ম্যামালিয়ারি নিউক্লিয়াস’ বা ‘TMN’ নামে স্নায়ুগুলি থেকে। ঘুমের সময়, ‘হাইপোথ্যালামাস’-এর ‘ঘুমের জন্য দায়ী’ ‘ভেনট্রোল্যাটেরাল প্রি-অপটিক নি‌উক্লিয়াস’ বা, ‘VLPO’ স্নায়ুকোষগুলো উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এই সময়টিতে তারা ক্রমাগত ‘জাগিয়ে রাখার’ স্নায়ুকোষগুলোকে পুরোপুরি দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়। এ ভাবে ‘রাসায়নিক বার্তা’র (রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে যে বার্তা পাঠানো হয়) মাধ্যমে ‘হাইপোথ্যালামাসে’র ‘TMN’স্নায়ুকোষগুলোকে ‘জাগ্রত অবস্থা’থেকে ‘নিদ্রা’য় রুপান্তরিত করার সঙ্কেত পাঠায়। এ যেন জোয়ার আর ভাঁটার খেলা! মস্তিষ্কের এই ‘সুইচ’টিই আমাদের ‘নিদ্রা’ আর ‘জাগরণে’র জন্য দায়ী।

আমাদের শরীর কী ভাবে বুঝতে পারে, এখন ঘুমের প্রয়োজন, নাকি বিশ্রামের?

সেটা সম্ভব হয়, আমাদের প্রত্যেকের শরীরের ‘কার্ডিয়াক রিদ্‌ম’ বা, দেহের ঘড়ির জন্য। ২৪ ঘণ্টাতে দিনে কত ক্ষণ আমরা জেগে থাকব, আর রাতে কখন আমরা ঘুমিয়ে পড়ব আর কত ক্ষণ ধরে ঘুমোব, তা ঠিক করে দেয় ওই ঘড়িটিই। ওই ঘডিই আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। যা সকালে বেশি হয়। আর রাতে কমে যায়। যেটা ‘কার্ডিয়াক রিদ্‌ম হরমোন’ও সূর্যের আলোর ওপরেই নির্ভর করে।

তাই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ভ্রমণ করলে, সেই ঘড়িটি ঠিক ভাবে কাজ করে না। যাকে ‘জেট ল্যাগ’ বলে।

তা হলে আমরা ঘুমোই কেন?

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গিয়েছে, ঘুম শুধুই আমাদের শারীরিক ভারসাম্যের পুনর্প্রতিষ্ঠা বা সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজনীয়, তা নয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক আরও একটি অত্যন্ত জরুরি কাজ করে ফেলে নীরবে। সেটি হল- স্মৃতি (মেমরি) তৈরি বা, রক্ষা করা। এই সময়ে মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ এলাকাটি বেছে বেছে কিছু কিছু ‘সাময়িক স্মৃতি’কে ‘দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে’ বদলে দেয়। সমসাময়িক কালে আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে ‘ঘুম প্রক্রিয়া’টি বোঝা অনেকটাই সম্ভব হয়েছে ডাক্তার ইউজিন অ্যাসারিনস্কির ‘REM’ বা, ‘Rapid Eye Movement Sleep’ অবস্থাটি আবিস্কারের ফলে। এই অসামান্য কাজটি কিন্তু খানিকটা অজান্তেই ঘটেছিল। আর তার জন্য আমরা ধন্যবাদ দিতে পারি তাঁরই ছোট্ট ছেলে, আরমান্দ অ্যাসারিনস্কিকে।

১৯৫৩ সালে শিকাগো শহরে, আরমান্দের বাবা ইউজিন অ্যাসারিনস্কি তখন প্রোফেসর ক্লিটম্যানের অধীনে ছোট শিশুদের ওপর তাদের ‘মনোযোগ’ নিয়ে গবেষণা করছিলেন একটি EOG/EEG মেশিন নিয়ে। যার সাহায্যে চোখ ও মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ মাপা যায়। তিনি লক্ষ্য করলেন শিশুদের মনোযোগ ব্যাহত হয়, যখন তারা চোখ বন্ধ করে। তিনি ভাবলেন, ঘুমনোর সময় যখন তারা চোখ বন্ধ করে আর তার পরেও চোখের মণির নড়াচড়া হয়, তার সঙ্গে নিশ্চয়ই মনোযোগের কোনও না কোনও একটা সম্পর্ক রয়েছে। পরীক্ষা করার জন্য সেই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ছেলেকে মাথায় আদর করে চুমু খাওয়ার বদলে তার মাথায় লাগিয়ে দিলেন বেশ কিছু বিদ্যুদ্বাহক বা, ইলেকট্রোড। যেগুলি  কি না একটি পুরনো, ধার করা EEG মেশিনের ‘পেন’-এর সঙ্গে যুক্ত। সেই রাতে যখন ছোট্ট আরমান্দ ঘুমিয়ে পরল, তখনই EEG মেশিনের ‘পেন’টি ছোট ছোট তরঙ্গের আঁকিবুঁকি কাটতে শুরু করল। আর  আরমান্দের চোখের মণির নড়াচড়ার সময় এত বেশি ঝিকিমিকি ও তড়িৎ-বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ধরা পড়তে শুরু করল যে, ইউজিন অ্যাসারিনস্কির মনে হল, ওই পুরনো মেশিনটির নিশ্চয়ই কিছু গণ্ডগোল হয়েছে। পরে তাঁর পরীক্ষার কথা যখন তিনি প্রোফেসর ক্লিটম্যানকে জানালেন, তখন তাঁরা দু’জনে মিলে ঘুমের ওই লাগামছাড়া তরঙ্গটিকে ‘Rapid Eye Movement’ বা, ‘REM’ নাম দিলেন। আর সেই সময়টুকুতেই যে আমরা স্বপ্ন দেখি, সেটাও প্রমাণ করে দেখালেন।

‘ঘুম’ আর ‘স্বপ্ন’ সংক্রান্ত বিষয়ে এটা নিঃসন্দেহেই একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার।

সেই কাজের ভিত্তিতে আর অন্য অনেক বিজ্ঞানীদের কাজ থেকে আজ আমরা জানি  ‘ঘুম’কে চার ভাগে ভাগ করা যায় । ‘ঘুম’-এর বিভিন্ন স্তরকে  ‘NREM-1’, ‘NREM-2’ আর ‘NREM-3’ বা, ‘NREM-4’ এবং ‘REM’ বলা হয়। ঘুমের প্রত্যেকটি অধ্যায়কে চিহ্নিত করা গিয়েছে EEG মেশিনের বিভিন্ন তরঙ্গের আঁকিবুঁকির তফাৎ থেকে।  ঘুমের শুরু হওয়ার প্রথম অধ্যায়- ‘NREM-1’টি কিন্তু খুব পাতলা। তাকে  ‘হিপ্‌নোজেনিক স্টেট’ বলে। ওই সময় পেশীর সঙ্কোচন, আর ওপর থেকে পড়ে যাওয়ার অনুভুতি হয়, এবং বাইরের শব্দও (মায়ের ঘুম পাড়ানি  গান) উপলব্ধি করা জায়।  ঘুম যখন আরও একটু গাঢ় হয়, যাকে ‘NREM-2’বলে, সে সময় মস্তিষ্কের তরঙ্গগুলো ‘টাকু’ বা, ‘স্পিন্ডল শেপ’ ও ‘কে-কমপ্লেক্স’ নামে আরও এক অন্য রকমের EEG-তরঙ্গ সৃষ্টি করে। ওই সময়ে বাইরের গোলমাল নিদ্রা-ভঙ্গ করে না। মস্তিষ্ক তখন আমাদের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে। ‘NREM-3’ আর ‘NREM-4’-এ আমরা ঘুমের আরও গভীরে ডুবে যাই। যদিও সেই সময়ে আমরা স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আসলে স্বপ্নটা দেখার শুরু হয়, ‘REM-Sleep’-শুরু  হলে । সেই সময়টিই গভীর ঘুম আর স্বপ্ন দেখার সময়। এই সময় চোখের মণির নড়াচড়া লক্ষ্য করা যায় আর আমাদের পেশীগুলি পুরোপুরি অবশ হয়ে যায় । এই ‘REM-Sleep’টি ঘুম আর শারীরিক বিশ্রামের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ৫0 শতাংশ আর এক জন প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ঘুম হল- ‘REM-Sleep’।শিশুদের ক্ষেত্রে ‘REM-Sleep’ এক রকম অপরিহার্য। ঘুমের এই অবস্থাটি মানুষের সৃজনশীলতা, স্থায়ী স্মৃতির জন্ম দেওয়া, স্বপ্ন দেখা ও মনের বা মেজাজের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য দায়ী। ঘুমিয়ে পড়ার ৭০-৯০ মিনিটের মধ্যে ‘REM-Sleep’-এর আবির্ভাব ঘটে। আর গোটা রাতে ঘুমের এই পর্যায়গুলির ৩-৪ বার পুনরাবৃত্তি ঘটে। কাজেই এক রাতে ৩ থেকে ৪ বার ‘REM-Sleep’ হতে থাকে। ওই সময়ে যদি আমাদের ঘুম হঠাৎ করে ভেঙে যায়,তা হলে সেই সময়ের দেখা স্বপ্নকে আমরা মনে রাখতে পারি।

কিন্তু এই অবস্থাগুলির প্রয়োজন কেন ও কোথায়?

EEG-র এই বিশেষ তরঙ্গগুলোকে বাখ্যা করে জানা গিয়েছে, ঘুমের এই অবস্থাগুলির কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে, ঘুম-সংক্রান্ত নানা রকমের অসুখ দেখা দেয়। লাগাতার ঘুম না হওয়ার জন্য মানসিক অবসাদ, ওজন বেড়ে যাওয়া, আত্মহত্যার প্রবণতা, মানসিক উদ্বেগ ও শারীরিক অবসাদে ভুগি আমরা।

এর ফলে, আশা করা যায়, আগামী দিনে হদিশ পাওয়া যাবে, ঘুমের সিঁড়িগুলির কোন কোন অংশের ভাঙন রুখতে পারলে ঘুম-সংক্রান্ত কোন কোন রোগের  সঠিক চিকিৎসা করা যাবে।

তাই, ‘ঘুম নেই কেন চোখে’ সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে তখন আর কোনও অসুবিধে হবে না।

বুলা ঝা ভট্টাচার্য। (লেখিকা বিশিষ্ট নিউরো-সায়েন্টিস্ট। ইলিনয়ের শিকাগোয় নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অফ নিউরোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।)

সুত্রঃ আনন্দ বাজার

 

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.