অনলাইনে কাজ করা আর দৈনন্দিন ৯ টা ৫ টা অন্য কারো অফিসে চাকরি করা এক কথা নয়। এখানে অনলাইনে কাজ বলতে ফ্রিল্যান্সিং অথবা নিজের কোন প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও বিক্রয়  অথবা অন্যের প্রোডাক্ট বিক্রয় করাকে বুঝাচ্ছি।

ধরুন আপনি কোন একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছেন। সেখানে আপনার কাজের চেকলিস্ট থাকবে, নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে আসতে হবে, আপনার বয়োজ্যৈষ্ঠ কোন অফিসার আপনার কাজের তদারকি করবে এবং মাস শেষে আপনি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন পাবেন। অফিস যখন মনে করবে যে আপনি ভালো করছেন, আপনি প্রমোশন পাবেন এবং বেতন বৃদ্ধি পাবে। মোটামুটি বছর দুই আপনাকে সেইম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এটা সব ধরনের প্রাইভেট জবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কিন্তু আপনি যদি অনলাইনে কিছু করার চিন্তা করেন, হতে পারে সেটা ফ্রিল্যান্সিং অথবা নিজের প্রোডাক্ট বিক্রি অথবা এফিলিয়েশন;  তখন কিন্তু আপনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তখন আপনি নিজেই আপনার বস, আপনার ছোট্ট কম্পিউটার টেবিলটি আপনার অফিস। এখানে ঠিকমতো অফিসের আসার অথবা বের হওয়ার বালাই নাই, বসের চোখ রাঙ্গানি নাই, দুপুরের খাবার ৩০ মিনিটেই শেষ করার তাগাদা নাই।

এখানে আপনার নিজের কাজের চেকলিস্ট নিজেকেই বানিয়ে নিতে হবে। নিজেকেই হতে হবে বস এবং নিজেকেই হতে হবে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার আবার নিজেই নিজের কাজের ডেলিভারি ম্যান (ক্লাইয়েন্টের কাছে কাজ জমা দেয়া অথবা কাস্টমারের কাছে আপনার বানানো প্রোডাক্ট পৌঁছে দেয়া)।

এখন পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক আছে। মনে মনে হয়তো ভাবছেন – এ আর এমন কি? এইগুলা তো কোন ব্যাপারই না!

বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। মানুষ মাত্রই স্বাধীনতা প্রেমী। আপনি যখনই চিন্তা করবেন এটা আপনার কাজ, তখনই আপনার অবচেতন মন বাগড়া দিবে। কাজের চেয়ে টং এর দোকানের চা-টা  এবং বন্ধুদের সাথে একটা জম্পেশ আড্ডা কতোটা মজার সেটা আপনার ব্রেইনে নক করাবে বার বার। লেটেস্ট কোন একটা মুভি দেখা কিংবা প্রিয় ফুটবল দল বার্সেলোনার ম্যাচটা কোনভাবেই মিস করতে দিতে চাইবে না আপনার মন। বন্ধুরা মিলে পিজ্জাহাটে খেতে যাচ্ছে; আপনার মনটা আঁকুপাঁকু করবে যে – যাই, একটু ঘুরে আসি। একদিনই তো!

কিন্তু আসলে কি মনের এই অবাধ স্বাধীনতা একদিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে? কখনোই না। খেয়াল করে দেখবেন, শুধু আজকেই মুভি দেখবো এই মনোভাবটা প্রায় প্রতিদিনের মুভি দেখায় রূপান্তরিত হয়। চায়ের দোকানের সেই একদিনের আড্ডাটা প্রতিদিনকার রুটিনে পরিণত হয়। একদিনের বার্সেলোনার ম্যাচ দেখা থেকে আপনি লা লিগা অথবা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা প্রিমিয়ার লিগের নিয়মিত দর্শক হয়ে যাচ্ছেন।

সুতরাং, ব্যাপারগুলো একদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দিনের পর দিন কাজ ফেলে বিনোদন জগতে বুঁদ হয়ে যাচ্ছেন। আগামীকাল থেকে কাজ শুরু করবো করবো করে সেই আগামীকালটা আর হচ্ছে না। আপনাকে ধমকানোর কেউ নেই। নির্দিষ্ট ডেডলাইনে কাজ শেষ না করতে পারায়, কোন বসের চোখ রাঙ্গানি নাই। মাস শেষে খরচের টাকাটা কোন না কোন ভাবে ম্যানেজ হয়ে যাচ্ছেই তো!

কিন্তু এভাবে কি চলে? এভাবে কি কাজ হয়? পৃথিবীর কোন একজনও কি এভাবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পেড়েছে?

না পারে না। তো কি করতে হবে?

কাজ। হাঁ, একমাত্র কাজই আপনাকে সাফল্য এনে দিবে। সফলতার কোন জাদুর দণ্ড নেই। কোন তন্ত্র মন্ত্র নেই। ফ্রিল্যান্সিং বলেন আর উদ্যোক্তা বলেন – আলাদীনের চেরাগের দৈত্য হয়ে কেউ আসবে না। নিজেকেই দৈত্য হয়ে উঠতে হবে। মুক্তপেশার এ যুগে নিজের ল্যাপটপ কম্পিউটারকেই বানাতে হবে আলাদীনের চেরাগ।

এখন কথা হচ্ছে, কতক্ষণ কাজ করবো আমরা? কারন, কাজের বাইরের জগতকে আমরা একেবারে ছুঁড়ে ফেলতে পারবো না। বন্ধুদেরকে একদম ভুলে থাকতে পারবো না। পাড়ার মোড়ে চাও খেতে হবে। নিজের পরিবারকে সময় দিতে হবে। তাহলে কিভাবে এবং কতক্ষণ কাজ করবো?

বিখ্যাত বই 4-Hour WorkWeek এর লেখক Tim Ferriss একটি কাগজে দিনের অসংখ্য কাজের মধ্য থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩ টি কাজ লিখে রাখতেন। এবং তিনি সবসময় ৩ টি থেকে যেকোনো ১ টা কাজ অবশ্যই সম্পন্ন করার চেষ্টা করতেন। উনার মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ঠিকঠাক সম্পন্ন করতে পারলে বাকি কাজগুলোতে এর প্রভাব পড়ে। সুতরাং, To Do লিস্টে প্রচুর কাজ লিখে রাখলেই কাজ সম্পন্ন হয় না। বরং বেশ গুরুত্বপূর্ণ ১টি বা ২টি কাজ লিখে সেগুলো আগে সম্পন্ন করা উচিত।

আমরা যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে অনলাইনে কাজ করবো; হতে পারে সেটা যে কোন ধরনের কাজ, প্রথম পদক্ষেপ হবে একটি চেকলিস্ট তৈরি করা।

চেকলিস্ট কিভাবে তৈরি করবেন?

ধরুন আপনি যদি ফ্রিল্যান্সিং করতে চান, প্রথমে আপনার কাজ হবে আপনি যেই বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং করবেন সেই বিষয়টা ভালো করে শেখা। তো আপনার চেকলিস্টে প্রথমে থাকবে স্কিল ডেভেলপমেন্ট, তারপরে মার্কেটপ্লেসে একাউন্ট তৈরি করা, তারপর প্রোফাইল সাজানো, বিভিন্ন রিলেভেন্ট কাজে বিদ করা, তারপর ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন ও কাজ ডেলিভারি।

উপরে উল্লেখ করা প্রতিটা চেকলিস্ট আপনার একেকটি বড় কাজ। এই বড় কাজটি আপনি ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিবেন। এবং এই ছোট ছোট কাজগুলোই আপনার To Do লিস্টে যোগ করবেন।

To Do লিস্ট বানানোর জন্যে আপনার এন্ড্রয়েড অথবা আইফোনে Any.Do অথবা Wunderlist অথবা Google Keep ব্যবহার করতে পারেন। সাদামাটা কাগজ অথবা প্যাডও ব্যবহার করতে পারেন চাইলে।

এই To Do লিস্ট বানানো এবং Checklist বানানো মানে হচ্ছে আপনি আপনার মনকে সেট করতে পেরেছেন যে আপনি এখন থেকে কাজ করার জন্যে প্রস্তুত। এই মাইন্ডসেটটা খুব জরুরি।

মাইন্ডসেট ঠিকঠাক করার পর চলুন একটু কাজ করার অনুপ্রেরণা নিই। বিখ্যাত লেখক ও মটিভেশনাল স্পিকার  Robert Kiyosaki এর একটি বিখ্যাত কথা আছে। কথাটি এরকম ঃ “Your future is created by what you do today, not tomorrow”.

খেয়াল করে দেখবেন, আপনি যদি কোন কিছু শিখতে চান বা করতে চান, আজকেই যদি কাজে নেমে পড়েন দেখবেন কাজ বেশ এগিয়ে গেছে বা আপনি অনেক কিছু আজকেই শিখে ফেলেছেন। কিন্তু ভুল করেও যদি এই লেখার প্রথমদিককার মতো করে বলেন যে – আজকে থাক, কাল থেকে সিরিয়াসলি বসবো। দেখবেন সেই কাল পার হয়ে পরশুও চলে আসছে কিন্তু কাজে আর বসা হচ্ছে না।

বিখ্যাত লেখক Plato কে তো আমরা সবাই চিনি, তাইনা? তার একটা কথা আছে ঃ “The beginning is the most important part of the work”.

আমাদের যেহেতু মাইন্ডসেট করা আছে, চেকলিস্ট করা আছে; সেহেতু আমাদের এই পার্টে বেশ গুরুত্ব দিতে হবে। জাস্ট শুরু করে দিন। শুরু করার দেয়া মানেই কাজ ৫০% এগিয়ে নেয়া। শুরু না করলে বুঝবেন কিভাবে যে আপনি কি পারেন বা কি পারেন না?

চীন দেশের এক স্বনামধন্য দার্শনিক ছিলেন। তার নাম হল Lao Tzu. তার একটি কথা আজকের এই ২০১৫তে এসেও মানুষ মন্ত্রের মতো মানে। সেটি হচ্ছে ঃ ‘A journey of a thousand miles begins with a single step.’

সুতরাং হাজার মাইল পাড়ি দেয়া যদি আপনার স্বপ্ন হয়; তবে আজকে এক কদম আগান। এক কদম এক কদম করেই আপনি হাজার মাইল পাড়ি দিতে পারবেন। আজকে আমরা যাদের সফল হিসেবে চিনি তাদের এই এক পা এক পা করে হাজার মাইল পাড়ি দিয়েই সফল হতে হয়েছে।

আমি যদিও নিজেকে ১০০% সফল বলে দাবি করি না। কিন্তু আজকে ২০১৫ সালে আমার যেই পজিশন (আলহামদুলিল্লাহ্‌); তা সেই ২০০৮ থেকে এক পা এক পা করে এগোনোতেই সম্ভব হয়েছে। আমার কোন জাদুদণ্ড ছিলো না। আলাদীনের চেরাগও ছিলো না। সামনে আরও হাজার মাইল পড়ে আছে; সেটাও অতিক্রম করবো বলে মাইন্ডসেট ঠিক করেছি। আপনি যদি DevsTeam এর আমার বন্ধুদের দিকে তাকান; সবাইকেই অনেক চড়াই-উৎরাই পেড়িয়ে, অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে আজকে নিজেদের একেকজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

সুতরাং, শেষ কথা হলঃ ঠিকঠাক মাইন্ডসেট আর আজকেই লেগে যাওয়া। বাকিটা ভবিষ্যৎ, সময় আর মহান আল্লাহ্‌ তাআলার কাছেই ছেড়ে দিন না!

শুভ কামনা রইলো।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.